ফিচার ছবি: মোস্তাক আহমেদ, CC BY-SA 2.0 (Wikimedia Commons)।
ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের ধারাবাহিক আন্দোলন। এই আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়, আর পরে সেই ২১ ফেব্রুয়ারিই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই লেখায় ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পুরো ধারাবাহিকতা, ভাষা শহীদদের নাম, প্রথম শহীদ মিনারের গল্প এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথ একসাথে পাবেন।
ভাষা আন্দোলন কী ছিল এবং কেন শুরু হয়েছিল
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তান নামে নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই রাষ্ট্রের দুটি অংশ ছিল, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান, যাদের মাঝে ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়াও ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনে বড় পার্থক্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা, আর এখানকার মানুষের বড় অংশই বাংলায় কথা বলতেন, পড়াশোনা করতেন এবং দৈনন্দিন কাজ করতেন। নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি রাষ্ট্রভাষা ঠিক করার প্রশ্ন উঠলে কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশ শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন।
পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা এই প্রস্তাব মেনে নেননি। তাঁদের দাবি ছিল স্পষ্ট, বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হবে, আর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও স্বীকৃতি পাবে। এই দাবি শুধু একটি ভাষার মর্যাদার প্রশ্ন ছিল না, এটি ছিল শিক্ষা, চাকরি, আদালত ও সরকারি কাজে নিজের ভাষায় কাজ করার অধিকারের প্রশ্ন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, এই স্লোগান তাই খুব দ্রুত ঢাকার ছাত্রদের মুখ থেকে সাধারণ মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
এই আন্দোলনকে বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো এক দিনের ঘটনা ছিল না। ১৯৪৭ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলনটি ধাপে ধাপে এগিয়েছে। মাঝে কয়েক বছর আন্দোলন কিছুটা থেমে থাকলেও দাবিটি কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ১৯৫২ সালে আবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮: রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নের শুরু
১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রদের একটি সভা থেকে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে। এর কারণ ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার তখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে খবর ছড়িয়েছিল। একই বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়া। এই পরিষদ ভাষার দাবিকে একটি সংগঠিত আন্দোলনের রূপ দিতে সাহায্য করে।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন, যাতে গণপরিষদের ভাষার তালিকায় বাংলা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। কেন্দ্রীয় নেতারা, যাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন, এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এই ঘটনা পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়, কারণ গণপরিষদে নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগটুকুও তখন মেলেনি।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের শহরগুলোতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এই ধর্মঘটের কারণগুলোর মধ্যে ছিল গণপরিষদের ভাষা থেকে বাংলা বাদ পড়া, মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা অক্ষর না থাকা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগ পরীক্ষায় শুধু উর্দু ব্যবহার। ধর্মঘটের পর খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সই করেন, কিন্তু সেই চুক্তিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি মানা হয়নি। ফলে আন্দোলনের মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যায়।
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ২১ মার্চ ঢাকায় এক জনসভায় তিনি বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে শুধু উর্দু। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে তিনি একই অবস্থান আবার জানান। এই দুটি বক্তব্য পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যদিও তখনই বড় সংঘর্ষের দিকে পরিস্থিতি গড়ায়নি। আন্দোলন পরের বছরগুলোতে ধীরে ধীরে নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫১: আন্দোলনের মধ্যবর্তী বছরগুলো
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মারা যান। এরপর কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব বদলাতে থাকে, আর ভাষার প্রশ্নটি কিছুদিনের জন্য বড় আন্দোলনের রূপ নেয়নি। তবে ঢাকার ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ভাষার দাবি নিয়ে আলোচনা, সভা ও লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকে। এই সময়টিকে শুধু নীরব সময় বললে ভুল হবে, কারণ এই সময়েই দাবিটি সাধারণ মানুষের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।
১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মারা যান। তাঁর পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। নেতৃত্ব বদলের পর ভাষার প্রশ্ন আবার সামনে আসে, কারণ নতুন প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটোই ছিল। ১৯৫২ সালের শুরুতে সেই উদ্বেগ একটি সরাসরি সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।
১৯৫২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি: আন্দোলন আবার চূড়ান্ত রূপ নেয়
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন করাচি থেকে ঢাকায় এসে পল্টন ময়দানে বলেন, প্রদেশ নিজের প্রাদেশিক ভাষা ঠিক করতে পারবে, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে শুধু উর্দু। এই বক্তব্যের পর ছাত্ররা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। পরের দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট, সভা ও মিছিলের কর্মসূচি দ্রুত বাড়তে থাকে।
৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। ৩১ জানুয়ারি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর একটি সভা থেকে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। এই কমিটি ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে হরতাল ও বিক্ষোভের ডাক দেয়। একই সময়ে বাংলাকে আরবি হরফে লেখার একটি প্রস্তাবও ওঠে, যার তীব্র বিরোধিতা করেন ছাত্ররা।
৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয়। এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির হরতালকে ঘিরে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সরকার ঢাকায় সভা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, আর আন্দোলনকারীরা সেই নিষেধাজ্ঞা মানবেন কিনা, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যেও মতভেদে পড়েন। এই মতভেদ ২১ ফেব্রুয়ারির সকালের ঘটনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ | পল্টন ময়দানে খাজা নাজিমুদ্দিন শুধু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেন |
| ৩০ জানুয়ারি ১৯৫২ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট |
| ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ | সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন, ২১ ফেব্রুয়ারি হরতালের ডাক |
| ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ | শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট |
| ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ | ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি, সভা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ |
| ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ | ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলি, কয়েকজন নিহত |
| ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ | শোক মিছিল ও বিক্ষোভ, আরও প্রাণহানি |
| ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ | ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ |
| ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ | প্রথম শহীদ মিনার উদ্বোধন, একই দিন বিকেলে পুলিশ তা ভেঙে দেয় |
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ১৪৪ ধারা, মিছিল ও গুলি
২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে, যার মাধ্যমে সভা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। সেই রাতে কেন্দ্রীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কিনা, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে সংঘর্ষ হতে পারে, আবার কেউ কেউ মনে করেন, হরতালের ডাক দেওয়ার পর পিছু হটা ঠিক হবে না। এই মতভেদের মধ্যেই ২১ ফেব্রুয়ারির সকাল আসে।
২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, তখনকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে, ছাত্রদের একটি সভা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকরা ছাত্রদের নিষেধাজ্ঞা না ভাঙার অনুরোধ করেন। ছাত্রদের একাংশ তখনও দৃঢ় থাকেন এবং সভা থেকে ছোট ছোট দলে মিছিল বের হতে থাকে। পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ করে, তারপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে, আর শেষ পর্যন্ত গণপরিষদ ভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়।
এই গুলিতে সেদিনই কয়েকজন ছাত্র ও তরুণ প্রাণ হারান। একই সময়ে গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল, আর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অধিবেশনের ভেতর থেকেও প্রতিবাদ ওঠে। সেদিনের ঘটনা ঢাকার বাইরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আর ভাষার দাবিটি তখন আর শুধু ছাত্রদের দাবি থাকে না, এটি সারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের দাবিতে পরিণত হয়।
ভাষা শহীদ: যাঁদের নাম নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত
ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নাম নিয়ে অনেক লেখায় একটি ভুল দেখা যায়, যেখানে পাঁচজনের নাম একসাথে দিয়ে বলা হয় তাঁরা সবাই ২১ ফেব্রুয়ারিতেই মারা গিয়েছিলেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী বিষয়টি এত সরল নয়। কেউ ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিতে আহত হয়ে সেদিনই মারা যান, কেউ সেদিন আহত হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান, আর কেউ পরের দিনের বিক্ষোভে প্রাণ হারান। এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে বলা জরুরি, কারণ শহীদদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য সঠিক তথ্যই সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
| নাম | কখন |
|---|---|
| রফিকউদ্দিন আহমদ | ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ |
| আবদুল জব্বার | ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ |
| আবুল বরকত | ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ |
| আবদুস সালাম | ২১ ফেব্রুয়ারি আহত হন, পরে হাসপাতালে মারা যান |
| শফিউর রহমান | ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ |
এই পাঁচজনের বাইরেও আরও প্রাণহানির কথা নির্ভরযোগ্য সূত্রে উল্লেখ আছে। তাই এই লেখায় ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির মোট মৃতের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে দেওয়া হয়নি, কারণ সূত্রগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে পার্থক্য আছে। পাঁচজনের নাম এখানে দেওয়া হয়েছে, কারণ এই নামগুলোই সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত।
২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি: শোক, প্রতিবাদ ও প্রথম শহীদ মিনার
২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শোক মিছিল বের হয় এবং বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে। সেদিনও পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং আরও প্রাণহানি ঘটে। শহরের পরিবেশ তখন শোক আর ক্ষোভে ভরা ছিল। মানুষ শহীদদের স্মরণে কিছু একটা করতে চাইছিলেন, যাতে এই দিনটি শুধু একটি খবর হয়ে না থাকে।
২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের উদ্যোগে গুলির ঘটনাস্থলের কাছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এটিই প্রথম শহীদ মিনার। এই মিনারের ভিত্তি ছিল ১০ দশমিক ৫ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট চওড়া, বাংলা পিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে দৈনিক আজাদের তখনকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন এই মিনার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। একই দিন বিকেলে পুলিশ মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং মিনারটি ভেঙে দেয়।
প্রথম মিনারটি মাত্র কয়েক দিন টিকেছিল, কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যায়। ভেঙে দেওয়ার পরও শহীদ মিনারের ধারণাটি মানুষের মনে গেঁথে যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়, আর ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে।
১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬: বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেল কীভাবে
১৯৫২ সালের পর আন্দোলন থেমে যায়নি, বরং রাজনৈতিকভাবে আরও এগিয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের জয়ের পর জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির প্রশ্ন আবার জোরালোভাবে ওঠে। ১৯৫৪ সালের ৯ মে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই ধাপটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এর মাধ্যমে দাবিটি শুধু রাস্তার আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যায়।
এরপর ১৯৫৬ সালে চূড়ান্ত সাংবিধানিক ধাপটি আসে। ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে আদেল উদ্দিন আহমদের সংশোধনী প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে বাংলা ও উর্দু দুটোকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কার্যকর করা হয়। এই দুটি ধাপকে এক করে ফেললে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ভুল বোঝা হয়, তাই ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালের ঘটনাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
রাষ্ট্রভাষা শব্দটির অর্থ এখানে বোঝা দরকার। রাষ্ট্রভাষা মানে রাষ্ট্রের সরকারি কাজে ব্যবহৃত ভাষা, যার মাধ্যমে আইন, প্রশাসন ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে নিজের ভাষায় কাজ করার অধিকার নিশ্চিত হয়। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার অর্থ তাই ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিজের ভাষায় সরকারি ও শিক্ষার কাজ করতে পারবেন, আর বাংলা শুধু ঘরের ভাষা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

শহীদ মিনার: অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ থেকে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ
প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে দেওয়ার পর স্থায়ী একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি আরও জোরালো হয়। ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়, যেখানে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানটি শহীদ মিনারকে আবার জনসাধারণের সামনে নিয়ে আসে।
স্থায়ী মিনারের নির্মাণকাজ ১৯৫৭ সালে শুরু হয়। দীর্ঘ নির্মাণকাজের পর ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি স্থায়ী শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন হাসিনা বেগম। ঢাকায় এখন যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার দেখা যায়, সেটি এই স্থায়ী স্মৃতিসৌধ, প্রথম দিনের অস্থায়ী মিনারটি নয়। এই পার্থক্যটি মনে রাখলে প্রথম মিনারের গল্প আর বর্তমান মিনারের গল্প গুলিয়ে যায় না।
২১ ফেব্রুয়ারি কীভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো
ভাষা আন্দোলনের গল্পটি শুধু বাংলাদেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো (UNESCO, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা) এর সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই ঘোষণায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণ করার কথা বলা হয়। ২০০০ সাল থেকে এই দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হতে থাকে।
২০০২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ইউনেস্কোর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানায়। এখানে একটি সাধারণ ভুল এড়ানো জরুরি, জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালে এই দিনটি ঘোষণা করেনি, ঘোষণাটি দিয়েছিল ইউনেস্কো, আর জাতিসংঘ পরে তা স্বাগত জানায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য হলো ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বহুভাষিকতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। এই উদ্দেশ্যটি বোঝা গেলে বোঝা যায়, কেন একটি দেশের ভাষা আন্দোলনের দিন বিশ্বের সব ভাষার দিন হয়ে উঠল।
বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনে মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের শ্রদ্ধা জানান, আর ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে একুশে বইমেলার মতো সাংস্কৃতিক আয়োজন চলে। আন্তর্জাতিকভাবে এই দিনটি এখন সব মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দিন হিসেবে পরিচিত, যা ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের একটি বড় প্রমাণ।
ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য
ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, এটি দেখিয়ে দিয়েছিল যে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির পরিচয়ের অংশ। নিজের ভাষায় শিক্ষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার ছাড়া একটি জাতির আত্মমর্যাদা পূর্ণ হয় না, এই বোধটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়। এই বোধ পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নতুন গতি আনে।
আন্দোলনের আরেকটি তাৎপর্য হলো, এটি ছাত্র ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের একটি উদাহরণ হয়ে থাকে। একটি দাবি যখন রাস্তা থেকে সংসদ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়, তখন তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। ভাষা আন্দোলন সেই ধারাবাহিকতারই একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে ১৯৪৭ সালের দাবি ১৯৫৬ সালে গিয়ে পূর্ণতা পায় এবং ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
সচরাচর প্রশ্ন
২১ ফেব্রুয়ারি কেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়?
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে দিনটি সারা বিশ্বে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর দিন হিসেবে পালিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের শহীদ কারা?
সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত পাঁচজন হলেন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার ও আবুল বরকত, যাঁরা ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাণ হারান, আবদুস সালাম, যিনি সেদিন আহত হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান, এবং শফিউর রহমান, যিনি ২২ ফেব্রুয়ারি প্রাণ হারান। এর বাইরেও আরও প্রাণহানির কথা সূত্রে আছে, তাই মোট সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে দেওয়া হয়নি।
প্রথম শহীদ মিনার কবে তৈরি হয়েছিল, এবং এখন ঢাকায় যে মিনার দেখা যায় সেটা কি সেই মিনার?
প্রথম শহীদ মিনার তৈরি হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, আর ২৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের দিনই বিকেলে তা ভেঙে দেওয়া হয়। ঢাকায় এখন যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার দেখা যায়, সেটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ, যার নির্মাণ ১৯৫৭ সালে শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তা উদ্বোধন করা হয়।
বাংলা কবে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেয়েছিল?
বাংলা ১৯৫৪ সালের ৯ মে জাতীয় পরিষদে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়, আর ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের সংশোধনীতে বাংলা ও উর্দু দুটোই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কার্যকর হয়। এই দুটি ধাপ আলাদা, তাই শুধু একটি তারিখ দিয়ে পুরো স্বীকৃতির গল্প বলা ঠিক হবে না।
তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, ভাষা আন্দোলন, বাংলাপিডিয়া, শহীদ মিনার, জাতিসংঘ প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ইউনেস্কো ঘোষণাকে স্বাগত।
