হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংস: কে কী দেখতে পাবে, ঠিক করবেন যেভাবে
হোয়াটসঅ্যাপে কে আপনার ছবি, শেষ দেখা বা স্ট্যাটাস দেখতে পাবে, তা ঠিক করা যায় সেটিংসের প্রাইভেসি (Privacy) অংশ থেকে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা পছন্দ আছে, সবাই, শুধু পরিচিতজন, নির্দিষ্ট কয়েকজন বাদে পরিচিতজন, অথবা কেউ নয়। দশ মিনিট সময় দিলে পুরো সেটিংস নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে ফেলা যায়।
অনেকেই জানেন না, ডিফল্ট অবস্থায় হোয়াটসঅ্যাপ বেশ খোলামেলা। আপনার নম্বর যার কাছে আছে, তিনি অনেক তথ্য দেখে ফেলতে পারেন। কোন তথ্য কে দেখবে, এই সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি আপনার হাতে। একবার ঠিক করে দিলে প্রতিদিন আর ভাবতে হয় না।
শুরু করার আগে যা জানা দরকার
প্রাইভেসি সেটিংস (Privacy Settings) মানে অন্য ব্যবহারকারীরা আপনার কোন কোন তথ্য দেখতে পাবেন, তার নিয়ন্ত্রণ। বেশিরভাগ সেটিংসেই চারটি পছন্দ থাকে। সবাই (Everyone) মানে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী যে কেউ, আমার পরিচিতজন (My Contacts) মানে যাদের নম্বর আপনার ফোনে সেভ করা আছে, নির্দিষ্ট কয়েকজন বাদে পরিচিতজন (My Contacts Except…) মানে বাদ দেওয়া ব্যক্তিদের ছাড়া বাকি পরিচিতজন, আর কেউ নয় (Nobody) মানে কেউই দেখতে পাবে না।
একটি নিয়ম মনে রাখুন। কিছু সেটিংস দুই দিকেই কাজ করে। আপনি নিজের তথ্য লুকালে অনেক ক্ষেত্রে অন্যের একই তথ্য দেখার সুযোগও হারাবেন। নিচে ধাপে ধাপে প্রতিটি সেটিংসের কাজ ও পছন্দ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
| সেটিংস | যা নিয়ন্ত্রণ করে | পছন্দসমূহ |
|---|---|---|
| শেষ দেখা ও অনলাইন | শেষ কখন সক্রিয় ছিলেন এবং এখন অনলাইনে আছেন কি না | সবাই / পরিচিতজন / কয়েকজন বাদে পরিচিতজন / কেউ নয় |
| প্রোফাইল ছবি | আপনার প্রোফাইলের ছবি কে দেখবে | সবাই / পরিচিতজন / কয়েকজন বাদে পরিচিতজন / কেউ নয় |
| অ্যাবাউট (About) | নামের নিচের ছোট পরিচিতি লেখা কে দেখবে | সবাই / পরিচিতজন / কয়েকজন বাদে পরিচিতজন / কেউ নয় |
| স্ট্যাটাস | আপনার স্ট্যাটাস আপডেট কে দেখবে | পরিচিতজন / কয়েকজন বাদে পরিচিতজন / নির্দিষ্ট জনের সঙ্গে শেয়ার |
| গ্রুপ | কে আপনাকে সরাসরি গ্রুপে যোগ করতে পারবে | সবাই / পরিচিতজন / কয়েকজন বাদে পরিচিতজন |
| রিড রিসিপ্ট | বার্তা পড়লে প্রেরক নীল টিক দেখবেন কি না | চালু / বন্ধ |
ধাপে ধাপে সেটিংস ঠিক করার পদ্ধতি
ধাপ ১: প্রাইভেসি সেটিংসে যান
অ্যান্ড্রয়েডে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে ওপরের তিন বিন্দুর মেনুতে চাপ দিন। সেখান থেকে সেটিংস (Settings), তারপর প্রাইভেসি (Privacy) বেছে নিন। আইফোনে নিচের সেটিংস ট্যাব থেকে সরাসরি প্রাইভেসি অংশে যাওয়া যায়। পরের সব ধাপ এই একটি পেজ থেকেই করা যাবে।
ধাপ ২: শেষ দেখা ও অনলাইন অবস্থা ঠিক করুন
প্রাইভেসি পেজের প্রথম অপশনটিই শেষ দেখা ও অনলাইন (Last Seen and Online)। এখানে লাস্ট সিন (Last Seen), অর্থাৎ শেষবার কখন হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেছেন সেই তথ্য, কে দেখতে পাবে তা বেছে নিন। অপরিচিতদের কাছ থেকে লুকাতে চাইলে আমার পরিচিতজন পছন্দটিই বেশিরভাগের জন্য যথেষ্ট।
এর নিচে অনলাইন অবস্থার পছন্দ থাকে। শেষ দেখার মতোই (Same as Last Seen) রাখলে একই নিয়ম দুটোতেই চলবে। একটি বিষয় জেনে রাখুন, নিজের শেষ দেখা লুকালে আপনি অন্য কারো শেষ দেখাও দেখতে পাবেন না। এই নিয়মটি হোয়াটসঅ্যাপের দুই পক্ষের জন্যই সমান।
ধাপ ৩: প্রোফাইল ছবি ও অ্যাবাউটের দর্শক ঠিক করুন
প্রাইভেসি পেজ থেকে প্রোফাইল ছবি (Profile Photo) অপশনে যান। পারিবারিক ছবি থাকলে সবাই পছন্দটি না রেখে আমার পরিচিতজন করে দিন। এতে অপরিচিত নম্বর থেকে কেউ আপনার ছবি দেখতে পাবে না। একইভাবে অ্যাবাউট (About) অংশের লেখাটির জন্যও একই পছন্দ ঠিক করে দিন।
এখানে একটি ভুল ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। ছবি বা অ্যাবাউট লুকালেও আপনার ফোন নম্বর লুকায় না। একই গ্রুপে থাকা সদস্যরা সাধারণত নম্বর দেখতে পারেন। তাই গ্রুপে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকাটাই আসল সুরক্ষা।
ধাপ ৪: স্ট্যাটাস কে দেখবে ঠিক করুন
স্ট্যাটাস (Status) অপশনে গেলে তিনটি পছন্দ পাবেন। আমার পরিচিতজন মানে সব পরিচিতজনই আপনার স্ট্যাটাস দেখতে পাবেন। কয়েকজন বাদে পরিচিতজন পছন্দে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া যায়। আর শুধু নির্দিষ্ট জনের সঙ্গে শেয়ার (Only Share With…) পছন্দে বেছে দেওয়া কয়েকজনই শুধু দেখতে পাবেন। ব্যক্তিগত মুহূর্তের স্ট্যাটাসের জন্য শেষের পছন্দটিই সবচেয়ে নিরাপদ।
ধাপ ৫: রিড রিসিপ্ট ঠিক করুন
রিড রিসিপ্ট (Read Receipts), অর্থাৎ বার্তা পড়ার পর প্রেরকের কাছে নীল টিক যাওয়ার ব্যবস্থা, এই পেজের একটি সুইচ দিয়েই বন্ধ করা যায়। বন্ধ করলে আপনি বার্তা পড়লেও প্রেরক নীল টিক দেখবেন না। একই সঙ্গে আপনিও অন্যের নীল টিক দেখতে পাবেন না।
দুটি ব্যতিক্রম মনে রাখুন। গ্রুপ চ্যাটে এই সেটিংস কাজ করে না, সেখানে পড়ার তথ্য সব সময়ই পাঠানো হয়। আর ভয়েস মেসেজ চালানোর তথ্যও এই সুইচে বন্ধ করা যায় না। তাই নীল টিক বন্ধ মানেই পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়।
ধাপ ৬: গ্রুপে কে যোগ করতে পারবে ঠিক করুন
গ্রুপ (Groups) অপশনে যান। ডিফল্ট অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই যে কেউ আপনাকে যেকোনো গ্রুপে যোগ করে দিতে পারে। পছন্দটি আমার পরিচিতজন করে দিলে অপরিচিত কেউ সরাসরি যোগ করতে পারবে না। যিনি পারবেন না, তিনি আপনাকে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ পাঠাতে পারবেন। আমন্ত্রণটি কয়েক দিনের মধ্যে গ্রহণ না করলে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, যোগ দেওয়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আপনারই থাকে।
ধাপ ৭: অপরিচিত নম্বরের কল নীরব করুন
প্রাইভেসি পেজের কল (Calls) অংশে যান। অজানা কলকারীদের নীরব করুন (Silence Unknown Callers) অপশনটি চালু করে দিন। এরপর সেভ করা নেই এমন নম্বর থেকে কল এলে ফোন বাজবে না। কলটি কল তালিকায় থেকে যাবে, পরে দেখে নিতে পারবেন। অপরিচিত নম্বরের বিরক্তিকর ও প্রতারণামূলক কল এড়াতে এই সেটিংসটি কাজের।
ধাপ ৮: ডিফল্ট মেসেজ টাইমার চালু করুন
ডিফল্ট মেসেজ টাইমার (Default Message Timer), অর্থাৎ নতুন চ্যাটের বার্তা নির্দিষ্ট সময় পর নিজে থেকে মুছে যাওয়ার ব্যবস্থা, প্রাইভেসি পেজের নিচের দিকে পাবেন। সময় হিসেবে ২৪ ঘণ্টা, ৭ দিন বা ৯০ দিন বেছে নেওয়া যায়। চালু করলে এরপর শুরু হওয়া নতুন ব্যক্তিগত চ্যাটে বার্তা সেই সময় পর মুছে যাবে। আগে থেকে চলা চ্যাটে এই নিয়ম নিজে থেকে চালু হয় না।
সতর্কতা হলো, বার্তা মুছে যাওয়া মানেই তা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া নয়। যাকে পাঠিয়েছেন, তিনি চাইলে ছবি তুলে বা অন্য ফোনে কপি করে রাখতে পারেন। সংবেদনশীল তথ্য পাঠানোর আগে এই ঝুঁকিটি মাথায় রাখুন।
ধাপ ৯: টু-স্টেপ ভেরিফিকেশনের পিন চালু করুন
সেটিংস থেকে অ্যাকাউন্ট (Account) অংশে যান। সেখানে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন (Two-Step Verification) অপশনে ছয় সংখ্যার একটি পিন (PIN) তৈরি করুন। এই পিন ছাড়া অন্য কেউ আপনার নম্বর দিয়ে নতুন ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ চালু করতে পারবে না। পিনটি মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপ নিজে থেকেও যাচাই করতে চাইতে পারে, যাতে আপনি ভুলে না যান।
পিনের সঙ্গে একটি ইমেইল ঠিকানা যোগ করে রাখুন। পিন ভুলে গেলে এই ইমেইল দিয়েই পিন ফিরিয়ে আনা যাবে। সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা, এই পিন বা মেসেজে আসা যাচাইকরণ কোড কারো সঙ্গে ভাগ করবেন না। কোড হাতে পেলেই অন্য কেউ আপনার নম্বর নিজের ফোনে চালু করে ফেলতে পারে।
ধাপ ১০: অ্যাডভান্সড সুরক্ষা ও অ্যাপ লক দেখে নিন
প্রাইভেসি পেজের একদম নিচে অ্যাডভান্সড (Advanced) অংশ থাকে। এখানে কলে আইপি ঠিকানা সুরক্ষিত রাখার (Protect IP Address in Calls) অপশনটি চালু করা যায়। এতে কলের সময় আপনার ডিভাইসের ঠিকানা অন্য পক্ষ সহজে জানতে পারে না। তবে এতে কিছু ক্ষেত্রে কলের মান সামান্য কমতে পারে।
একই পেজে অ্যাপ লক (App Lock) অপশন থাকলে সেটিও চালু করে দিন। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ খুলতে আঙুলের ছাপ বা ফোনের স্ক্রিন লক যাচাই লাগবে। ফোন অন্যের হাতে গেলেও আপনার চ্যাট সহজে খুলতে পারবে না।
সাধারণ ভুল ও ভুল ধারণা
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, স্ট্যাটাস লুকালেই বুঝি পুরো প্রোফাইল অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রতিটি তথ্যের নিয়ন্ত্রণ আলাদা। ছবি, শেষ দেখা, স্ট্যাটাস, প্রতিটির সেটিংস আলাদাভাবে ঠিক করতে হয়। একটি ঠিক করে বাকিগুলো আগের মতো রেখে দিলে সেগুলো আগের নিয়মেই দেখা যাবে।
দ্বিতীয় ভুল, শেষ দেখা বন্ধ করে অন্যের শেষ দেখা না দেখতে পেয়ে হোয়াটসঅ্যাপের ত্রুটি ভাবা। এটি ত্রুটি নয়, নিয়মটাই এমন। একই কথা নীল টিকের ক্ষেত্রেও। নিজের পড়ার তথ্য বন্ধ করলে অন্যেরটাও আর দেখা যায় না।
তৃতীয় ভুলটি হয় গ্রুপের ক্ষেত্রে। গ্রুপ সেটিংস বদলালে শুধু ভবিষ্যতে যোগ দেওয়ার নিয়ম বদলায়। যেসব গ্রুপে আগে থেকেই আছেন, সেখান থেকে এই সেটিংস আপনাকে বের করে দেবে না। পুরোনো অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রুপ থেকে নিজে বেরিয়ে আসতে হবে। আর গ্রুপে থাকলে সদস্যরা আপনার নম্বর দেখতে পারেন, এই বিষয়টি অনেকেই হিসাবে রাখেন না।
চতুর্থ ভুল, পিন বা কোড অন্যের সঙ্গে ভাগ করা। পরিচিত সেজে কেউ কোড চাইলে সেটি প্রতারণার চেষ্টা ধরে নিন। ব্যাংক বা হোয়াটসঅ্যাপের কোনো কর্মী আপনার পিন জানতে চাইবেন না। কোড জানাজানি মানেই অ্যাকাউন্ট হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি।
আরেকটি অভ্যাসগত ভুল হলো সেটিংস একবারও না দেখা। অ্যাপ আপডেটের পর নতুন প্রাইভেসি অপশন যোগ হতে পারে। কয়েক মাস পরপর প্রাইভেসি পেজটি একবার ঘুরে দেখলে নতুন অপশনগুলো নিজের পছন্দমতো রাখা যায়।
সারসংক্ষেপ
হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে আনা যায় দশটি ধাপে। প্রাইভেসি পেজে গিয়ে শেষ দেখা, ছবি, স্ট্যাটাস ও গ্রুপের পছন্দ ঠিক করুন। নীল টিক ও মেসেজ টাইমার নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী সাজান। সবশেষে টুব-স্টেপ ভেরিফিকেশনের পিন চালু করাটা বাদ দেবেন না, কারণ এটিই অ্যাকাউন্ট দখলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত বাধা। সেটিংস একবার সাজানো হলে অপরিচিতদের নজর থেকে ব্যক্তিগত তথ্য অনেকটাই নিরাপদ থাকে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
আমি কি নিজের ফোন নম্বর গোপন রাখতে পারি?
হোয়াটসঅ্যাপে নম্বরই হলো অ্যাকাউন্টের পরিচয়, তাই নম্বর পুরোপুরি গোপন রাখার অপশন নেই। যাদের সঙ্গে চ্যাট বা গ্রুপে আছেন, তারা নম্বরটি দেখতে পারেন। তবে ছবি, স্ট্যাটাস ও বাকি তথ্য সেটিংস দিয়ে সীমিত রাখা যায়।
শেষ দেখা বন্ধ করলে কি কেউ বুঝতে পারবে আমি অনলাইনে আছি?
অনলাইন অবস্থার পছন্দটি শেষ দেখার মতোই করে রাখলে অনলাইন থাকার তথ্যও একই গোষ্ঠীর বাইরে যাবে না। তবে যার সঙ্গে চ্যাট খোলা আছে, তিনি আপনি লিখছেন কি না তা দেখতে পারেন।
নীল টিক বন্ধ করলে গ্রুপে কি ঘটে?
গ্রুপ চ্যাটে এই সেটিংস প্রযোজ্য নয়। গ্রুপে বার্তা পড়লে সদস্যরা পড়ার তথ্য দেখতে পাবেন। ব্যক্তিগত চ্যাটেই শুধু নীল টিক বন্ধের সুবিধা কাজ করে।
পিন ভুলে গেলে কী করব?
পিন সেট করার সময় ইমেইল যোগ করে থাকলে সেই ইমেইল দিয়ে পিন পুনরায় সেট করা যায়। ইমেইল যোগ করা না থাকলে কিছুদিন অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করতে হতে পারে। ইমেইল যোগ করাটা তাই জরুরি ধাপ.