ব্যাটারি দীর্ঘদিন ভালো রাখার মূল নিয়ম তিনটি। ফোনকে অতিরিক্ত তাপ থেকে দূরে রাখুন, পুরো চার্জ হয়ে যাওয়ার পর বেশিক্ষণ চার্জারে লাগিয়ে রাখবেন না, আর ফোনের নিজস্ব চার্জ সুরক্ষা সেটিংসটি চালু করে দিন। বাকি সব অভ্যাস এই তিনটি নিয়মেরই বিস্তারিত রূপ।
অনেকেই ভাবেন ব্যাটারি খারাপ হওয়া মানে ফোনের দোষ। বাস্তবে ব্যাটারির আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের চার্জিংয়ের অভ্যাসের ওপর। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই ব্যাটারি অনেক দিন তার ধারণক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
ব্যাটারির ক্ষয় কেন হয়
আজকের প্রায় সব স্মার্টফোনে লিথিয়াম-আয়ন (Lithium-ion) ব্যাটারি, অর্থাৎ হালকা ওজন ও বেশি ধারণক্ষমতার জন্য ব্যবহৃত পুনরায় চার্জযোগ্য ব্যাটারি। এই ব্যাটারি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষয় হয়। অ্যাপলের ভাষায়, ব্যাটারির কার্যকারিতা নির্ভর করে তার রাসায়নিক বয়সের (Chemical Age) ওপর, যা শুধু সময়ের হিসাব নয়।
রাসায়নিক বয়স বাড়ে মূলত দুটি কারণে। একটি হলো তাপের ইতিহাস, ফোন কতটা গরম পরিবেশে থেকেছে ও চার্জ হয়েছে। অন্যটি হলো চার্জিংয়ের ধরন, কতবার ও কীভাবে চার্জ দেওয়া হয়েছে। সব রিচার্জেবল ব্যাটারিই ক্ষয়িষ্ণু জিনিস, অর্থাৎ ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এর ধারণক্ষমতা কমবেই। অভ্যাস ভালো হলে এই কমার গতি ধীর হয়, এটুকুই আমাদের হাতে আছে।
নিয়ম ১: ফোনকে তাপ থেকে বাঁচান
তাপ ব্যাটারির সবচেয়ে বড় শত্রু। অ্যাপল জানিয়েছে, ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে ফোন ব্যবহার বা চার্জ করলে ব্যাটারির আয়ু স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে। ফোনের জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রা হলো ১৬ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশ। আমাদের দেশের গরমে এই সীমা মেনে চলা সব সময় সম্ভব নয়, তবে সচেতন থাকলেই বড় ক্ষতি এড়ানো যায়।
- রোদে বা গরম গাড়ির ভেতরে ফোন ফেলে রাখবেন না
- চার্জ দেওয়ার সময় ফোন সরাসরি রোদের নিচে বা বালিশ-কম্বলের নিচে রাখবেন না
- চার্জের সময় ফোন অস্বাভাবিক গরম হলে মোটা কভারটি খুলে দিন, কিছু কভার তাপ আটকে রাখে
- গরম অবস্থায় ভারী গেম বা দীর্ঘ ভিডিও রেকর্ডিং এড়িয়ে চলুন
ঠান্ডার ক্ষেত্রে চিত্রটা আলাদা। খুব ঠান্ডায় ব্যাটারি সাময়িকভাবে দ্রুত শেষ হতে পারে, তবে তাপমাত্রা স্বাভাবিক হলে কার্যকারিতাও ফিরে আসে। স্থায়ী ক্ষতির আসল কারণ গরমটাই।
নিয়ম ২: পুরো চার্জে বেশিক্ষণ লাগিয়ে রাখবেন না
ব্যাটারি ১০০ শতাংশ হয়ে যাওয়ার পর চার্জারে লাগিয়ে রাখলে ফোন নিজে থেকেই চার্জ নেওয়া বন্ধ করে দেয়। অ্যাপলের তথ্য অনুযায়ী, চার্জ কমে ৯৫ শতাংশের নিচে নামলে আবার চার্জ শুরু হয়। অর্থাৎ সারা রাত চার্জে রাখলেই ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।
তবে একটি জায়গায় সতর্কতা আছে। ব্যাটারি পুরো চার্জ অবস্থায় যত বেশিক্ষণ থাকে, রাসায়নিক ক্ষয় তত বাড়ে। অ্যাপল নিজেও বলেছে, সম্ভব হলে পুরো চার্জ হয়ে গেলে ফোন চার্জার থেকে খুলে ফেলা ভালো। প্রতিদিন এমন করা বাস্তবে কঠিন, তাই এর সমাধান হিসেবে এসেছে পরের নিয়মের সেটিংসগুলো।
নিয়ম ৩: চার্জ সুরক্ষা সেটিংসটি চালু করুন
এখনকার প্রায় সব ফোনেই ব্যাটারি সুরক্ষার নিজস্ব সেটিংস আছে। সেটিংসটি নিজে থেকেই পুরো চার্জে থাকার সময় কমিয়ে দেয়। ব্র্যান্ডভেদে নাম ও পথ আলাদা, নিচে তিনটি প্রধান ব্র্যান্ডের পথ দেওয়া হলো।
আইফোনে অপ্টিমাইজড চার্জিং ও চার্জের সীমা
আইফোনে অপ্টিমাইজড ব্যাটারি চার্জিং (Optimized Battery Charging), অর্থাৎ আপনার রুটিন শিখে পুরো চার্জ হওয়ার সময় পিছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা, সাধারণত আগে থেকেই চালু থাকে। এটি রাতে চার্জ থামিয়ে রাখে ৮০ শতাংশের কাছাকাছি, আর আপনি ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাকিটুকু পুরো করে দেয়।
আইফোন ১৫ ও তার পরের মডেলে চার্জের সীমা (Charge Limit) বেঁধে দেওয়ার সুযোগও আছে। সেটিংস (Settings) থেকে ব্যাটারি (Battery), তারপর চার্জিং (Charging) অংশে যান। সেখানে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পাঁচ শতাংশ ধাপে সীমা বেছে নেওয়া যায়। সারা দিন চার্জারের কাছাকাছি থাকলে ৮০ বা ৮৫ শতাংশ সীমা ভালো কাজ করে।
স্যামসাং গ্যালাক্সিতে ব্যাটারি প্রোটেকশন
স্যামসাং ফোনে সেটিংস (Settings) থেকে ব্যাটারি (Battery) অংশে গেলে ব্যাটারি প্রোটেকশন (Battery Protection) অপশনটি পাবেন। নতুন মডেলগুলোতে তিনটি ধরন থাকে। বেসিক (Basic) ধরনে পুরো চার্জের পর চার্জ থেমে যায়, অ্যাডাপ্টিভ (Adaptive) ধরন ঘুমের সময় অনুযায়ী নিজে থেকে ধরন বদলায়, আর ম্যাক্সিমাম (Maximum) ধরনে চার্জ থেমে যায় ৮০ শতাংশে। পুরোনো মডেলে এই সুবিধাটি চালু করলে চার্জ সীমিত থাকে ৮৫ শতাংশে।
গুগল পিক্সেলে চার্জিং অপ্টিমাইজেশন
পিক্সেল ফোনে সেটিংস (Settings) থেকে ব্যাটারি (Battery), তারপর ব্যাটারি হেলথ (Battery Health) অংশে যান। সেখানে চার্জিং অপ্টিমাইজেশন (Charging Optimization) চালু করুন। এরপর দুটি পছন্দ পাবেন, অ্যাডাপ্টিভ চার্জিং (Adaptive Charging) আপনার অভ্যাস শিখে ঘুম ভাঙার আগেই পুরো চার্জ শেষ করে। আর লিমিট টু ৮০% (Limit to 80%) বেছে নিলে চার্জ কখনোই ৮০ শতাংশের বেশি ওঠে না।
| ব্র্যান্ড | সেটিংসের নাম | যেখানে পাবেন | যা করে |
|---|---|---|---|
| অ্যাপল আইফোন | অপ্টিমাইজড ব্যাটারি চার্জিং, চার্জ লিমিট (আইফোন ১৫+) | সেটিংস > ব্যাটারি > চার্জিং | পুরো চার্জের সময় পিছিয়ে দেয়, অথবা নির্দিষ্ট সীমায় চার্জ থামিয়ে দেয় |
| স্যামসাং গ্যালাক্সি | ব্যাটারি প্রোটেকশন | সেটিংস > ব্যাটারি > ব্যাটারি প্রোটেকশন | বেসিক, অ্যাডাপ্টিভ বা ম্যাক্সিমাম (৮০%) ধরনে চার্জ নিয়ন্ত্রণ করে |
| গুগল পিক্সেল | চার্জিং অপ্টিমাইজেশন | সেটিংস > ব্যাটারি > ব্যাটারি হেলথ > চার্জিং অপ্টিমাইজেশন | অ্যাডাপ্টিভ চার্জিং অথবা ৮০% সীমা |
নিয়ম ৪: মাঝামাঝি চার্জে রাখার অভ্যাস করুন
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে পুরোনো দিনের মতো পুরো শেষ করে চার্জ দেওয়ার নিয়ম নেই। সুবিধামতো যেকোনো সময় অল্প অল্প করে চার্জ দেওয়া যায়। বরং ব্যাটারি একদম শূন্যে নামিয়ে দেওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো। দিনের ব্যবহারের মধ্যে চার্জ মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকলে ব্যাটারির ওপর চাপ কম পড়ে।
চার্জ সাইকেল (Charge Cycle) বলতে বোঝায় ব্যাটারির মোট ধারণক্ষমতার সমপরিমাণ চার্জ ব্যবহার। অর্ধেক করে দুবার ব্যবহার করলেও একটি সাইকেল পূর্ণ হয়। অর্থাৎ ছোট ছোট চার্জে সাইকেল বেড়ে যায় না, মোট ব্যবহৃত চার্জের হিসাবটাই আসল। তবে এই নিয়মে চলতে গিয়ে চার্জ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। দরকারের দিনে পুরো চার্জ করে বেরিয়ে যান, মাঝে মাঝে এমন করলে বড় ক্ষতি হয় না।
নিয়ম ৫: দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে অর্ধেক চার্জে রাখুন
ফোন অনেক দিন ব্যবহার না করে রেখে দিলে একটি নিয়ম মেনে চলুন। অ্যাপলের পরামর্শ হলো, দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের সময় ব্যাটারি অর্ধেক চার্জ অবস্থায় রাখা। পুরো চার্জে বা পুরো খালি অবস্থায় মাসের পর মাস ফেলে রাখলে ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে। বন্ধ করে ঠান্ডা ও শুষ্ক জায়গায় রাখুন। কয়েক মাস পর বের করলে প্রথমে কিছুক্ষণ চার্জ দিয়ে তারপর চালু করুন।
নিয়ম ৬: চার্জার ও কেবলের দিকে খেয়াল রাখুন
ফোনের সঙ্গে দেওয়া চার্জার বা নির্ভরযোগ্য প্রস্তুতকারকের চার্জার ব্যবহার করাই নিরাপদ। খুব সস্তা ও অজানা চার্জার অনেক সময় অনিয়মিত বিদ্যুৎ দেয় এবং ফোন অতিরিক্ত গরম করে। চার্জের সময় ফোন অস্বাভাবিক গরম হলে প্রথমে চার্জার ও কেবল বদলে দেখুন। ক্ষতিগ্রস্ত, খোলা তারের কেবল ব্যবহার করা উচিত নয়, এতে ফোনের ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও থাকে। দ্রুত চার্জের সুবিধা ফোনে থাকলে প্রস্তুতকারকের অনুমোদিত চার্জারেই সেটি ব্যবহার করুন।
যেসব ভুল ধারণা ও ভুল অভ্যাসে ব্যাটারি ক্ষতি হয়
প্রথম ভুল ধারণা, নতুন ফোন কিনে প্রথমে লম্বা সময় চার্জ দিতে হয়। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে এমন কোনো নিয়ম নেই। বাক্স থেকে বের করেই স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার শুরু করা যায়। এই ভুল ধারণাটি পুরোনো ধরনের ব্যাটারির যুগের, যা এখনকার ব্যাটারিতে খাটে না।
দ্বিতীয় ভুল ধারণা, সারা রাত চার্জে রাখলেই ব্যাটারি পুড়ে যাবে। আগেই বলা হয়েছে, ফোন পুরো চার্জ হলে নিজে থেকে চার্জ নেওয়া বন্ধ করে। তবে পুরো চার্জ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকা ক্ষয় বাড়ায় বলে অপ্টিমাইজড চার্জিং ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ভয় নয়, সেটিংসটাই সমাধান।
তৃতীয় ভুল, ব্যাটারি হেলথের শতাংশ একটু কমলেই আতঙ্কিত হওয়া। ব্যাটারি ক্ষয়িষ্ণু অংশ, সময়ের সঙ্গে ধারণক্ষমতা ধীরে ধীরে কমা স্বাভাবিক ঘটনা। এক-দুই শতাংশ কমা মানে ফোন নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। সত্যিকারের সমস্যা বোঝা যায় যখন চার্জ অস্বাভাবিক দ্রুত শেষ হয় বা ফোন নিজে থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
চতুর্থ ভুল অভ্যাস, চার্জ দেওয়ার সময় বিছানা বা সোফার মতো নরম জায়গায় ফোন রাখা। এসব জায়গা তাপ বেরিয়ে যেতে দেয় না, ফোন গরম হয়ে ওঠে। টেবিলের মতো সমতল ও খোলা জায়গায় রেখে চার্জ দিন। গরমের দিনে চার্জের সময় ভারী কাজ করা থেকেও বিরত থাকুন।
সারসংক্ষেপ
ব্যাটারি ভালো রাখা কঠিন কোনো কাজ নয়। তাপ এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে ৩৫ ডিগ্রির বেশি গরমে চার্জ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজের ফোনের চার্জ সুরক্ষা সেটিংসটি একবার চালু করে দিন। সুযোগ হলে চার্জ মাঝামাঝি পর্যায়ে রাখুন এবং পুরো চার্জ হলে চার্জার খুলে ফেলুন। এই কয়েকটি অভ্যাসেই ব্যাটারি অনেক দিন নিজের ধারণক্ষমতা ধরে রাখবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রতিদিন ১০০ শতাংশ চার্জ করা কি খুব খারাপ?
পুরো চার্জ করা যেতেই পারে, বিশেষ করে বাইরে কাটানোর দিনে সেটাই দরকার। সমস্যা হয় পুরো চার্জ অবস্থায় ফোনকে নিয়মিত লম্বা সময় রেখে দিলে। সেজন্যই চার্জের সীমা বা অপ্টিমাইজড চার্জিং কাজে লাগে।
চার্জের সীমা ৮০ শতাংশে রাখলে দিনের চার্জ কম পাব কি?
পাবেন, প্রতিদিন ব্যবহারযোগ্য চার্জ কিছুটা কমবে। যারা দিনের শেষে হাতে চার্জ বেঁচে থাকেন, তাদের জন্য এই ত্যাগের বিনিময়ে ব্যাটারির আয়ু বাড়ে। লম্বা ভ্রমণের দিনে সীমাটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে পুরো চার্জ করে নেওয়া যায়।
ফাস্ট চার্জিং কি ব্যাটারির ক্ষতি করে?
ফোনের প্রস্তুতকারকের দেওয়া ব্যবস্থায় ফাস্ট চার্জিং চলাকালে তাপ নিয়ন্ত্রণের সুরক্ষা থাকে। ক্ষতির প্রধান কারণ গতি নয়, জমে ওঠা তাপ। তাই চার্জের সময় ফোন অস্বাভাবিক গরম হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখাই আসল বিষয়।
ব্যাটারি কতদিন পর বদলাতে হয়?
নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। যখন দেখবেন চার্জ একেবারেই টিকছে না বা ফোন অর্ধেক চার্জে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে পরীক্ষা করান। সেটিংসে ব্যাটারি হেলথের অবস্থা দেখে আন্দাজ করা যায়।