চাঁদ নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে যে সময় নেয়, পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতেও প্রায় সেই একই সময় লাগে, প্রায় ২৭.৩ দিন। দুটি গতির সময় মিলে গেছে বলেই চাঁদের একই পাশ সবসময় পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে।
শৈশবে আপনি যে চাঁদ দেখেছিলেন, আজকের চাঁদেও সেই একই গাঢ় দাগের নকশা চোখে পড়ে। কারণ দাগগুলো চাঁদের সেই পাশেই আঁকা, যে পাশটি কখনো আমাদের দিক থেকে সরে যায় না।
যে পাশটি আমরা দেখি, তাকে বলা হয় কাছের পাশ (Near Side), অর্থাৎ পৃথিবীর দিকে ফেরানো পাশ। আর যে পাশটি কোনো দিন পৃথিবীর দিকে ফেরে না, তার নাম দূরের পাশ (Far Side), অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থাকা পাশ। এই লেখায় অপর পাশ বলতে এই দূরের পাশকেই বোঝানো হয়েছে।
ঘূর্ণন আর পরিক্রমণ, দুটি আলাদা গতি
প্রথমে দুটি গতি আলাদা করে বুঝে নেওয়া দরকার। ঘূর্ণন মানে চাঁদের নিজের অক্ষের চারদিকে নিজে ঘোরা, লাটিম যেভাবে নিজের জায়গায় পাক খায়। পরিক্রমণ মানে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পুরো কক্ষপথটি একবার ঘুরে আসা।
দুটি গতি ঘটে একই সঙ্গে, লাটিমের মতো ঘুরতে ঘুরতেই চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে এগিয়ে চলে। NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, চাঁদের নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে লাগে প্রায় ২৭.৩ দিন। পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতেও লাগে প্রায় ২৭.৩ দিন, সংখ্যা দুটি প্রায় হুবহু সমান। এই মিলটাই পুরো রহস্যের চাবিকাঠি।
দুটি সময় মিলল কীভাবে
শুরুতে কিন্তু এমনটা ছিল না। চাঁদ জন্মের পর প্রথম দিকে নিজের অক্ষে অনেক দ্রুত ঘুরত, তখন তার নানা পাশ পালাক্রমে পৃথিবীর দিকে ফিরত।
পৃথিবীর অভিকর্ষ চাঁদের সব অংশে সমান টান দেয় না, কাছের অংশে টান বেশি, দূরের অংশে কম। এই অসম টানে চাঁদের আকৃতি সামান্য লম্বাটে হয়ে যায়, পৃথিবীর দিকে একটি অংশ ফুলে ওঠে।
চাঁদ ঘুরতে থাকলে সেই ফোলা অংশটি ঠিক পৃথিবীর দিকে থাকতে পারত না, ঘূর্ণনের তুলনায় একটু পিছিয়ে পড়ত। পৃথিবীর টান তখন ফোলা অংশটিকে নিজের দিকে টেনে সোজা করতে চাইত, আর এই টানাটানি চলত প্রতিটি পাকে। ভেতরের এই ঘষা ও টানে ঘূর্ণনের শক্তি ধীরে ধীরে তাপ হয়ে বেরিয়ে যেত, ফলে চাঁদের ঘূর্ণন ক্রমে ধীর হতে থাকে।
এভাবে চলতে চলতে একসময় ঘূর্ণনের সময় কমে পরিক্রমণের সময়ের সমান হয়ে যায়। তখন ফোলা অংশটি স্থিরভাবে পৃথিবীর দিকেই থাকে, টানাটানিও থেমে যায়, ঘূর্ণন আর ধীর হয় না।
এই অবস্থাকেই বলা হয় টাইডাল লকিং (Tidal Locking), অর্থাৎ জোয়ার-ভাটার টানে চাঁদের ঘূর্ণন পৃথিবীর সঙ্গে তালাবদ্ধ হয়ে যাওয়া। আর ঘূর্ণন ও পরিক্রমণের এই সময়ের মিলকে বলা হয় সিংক্রোনাস ঘূর্ণন (Synchronous Rotation), অর্থাৎ দুটি গতি ঠিক তালে তালে চলা।
এই ঘটনা শুধু আমাদের চাঁদের বেলায়ই ঘটেনি। NASA-এর মতে, সৌরজগতের বড় উপগ্রহগুলোর প্রায় সবই নিজ নিজ গ্রহের সঙ্গে এভাবেই তালাবদ্ধ। বড় উপগ্রহগুলো তাদের জীবনের শুরুর দিকেই এই তালে পৌঁছে যায়, বৃহস্পতি ও শনির বড় উপগ্রহগুলোর বেলায়ও একই নিয়ম দেখা যায়।
মজার বিষয়, এই টানাটানির প্রভাব আজও পুরোপুরি থামেনি। চাঁদ প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যদিও তার ঘূর্ণন এখন স্থির ও তালাবদ্ধ। একই টানে পৃথিবীর নিজের ঘূর্ণনও অতি ধীরে ধীরে কমছে, তবে তার মাত্রা এত কম যে দৈনন্দিন জীবনে তা ধরা পড়ে না।
বন্ধুকে ঘিরে হাঁটার উদাহরণ
বিষয়টি সহজে বুঝতে একটি উদাহরণ ভাবুন। আপনার বন্ধু একটি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনি তার চারদিকে বৃত্তাকারে হেঁটে চলেছেন। হাঁটার সময় আপনি যদি সবসময় বন্ধুর দিকেই মুখ করে থাকেন, একবার পুরো বৃত্ত শেষ করতে আপনার নিজেকেও ঠিক একবার ঘুরতে হবে।
বন্ধু তখন পুরো সময় শুধু আপনার মুখটাই দেখবেন, পিঠ কোনো দিনই দেখতে পাবেন না। চাঁদও ঠিক এই কাজটিই করে, পৃথিবীকে একবার ঘুরে আসার পথে নিজে ঠিক একবারই পাক খায়। তাই পৃথিবী থেকে শুধু তার এক পাশের মুখটাই দেখা যায়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। চাঁদ ঘোরে না, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল; চাঁদ ঘোরে, তবে পরিক্রমণের সঙ্গে হুবহু তাল মিলিয়ে ঘোরে। সে যদি আদৌ না ঘুরত, তাহলে এক মাসের মধ্যে তার সব পাশই আমরা দেখতে পেতাম।
তাহলে মোট দেখা যায় ৫৯ শতাংশ
তবে একই পাশ কথাটি শতভাগ কঠোর অর্থে সত্য নয়। চাঁদ আকাশে সামান্য একটি দুলুনি খায়, এই দুলুনিকে বলা হয় লিব্রেশন (Libration), অর্থাৎ চাঁদের এমন নড়াচড়া, যাতে কিনারা দিয়ে কিছুটা অতিরিক্ত অংশও দেখা যায়।
এর একটি কারণ, চাঁদের কক্ষপথ পুরোপুরি গোল নয়, সামান্য ডিম্বাকৃতি। ফলে কক্ষপথের কোথাও চাঁদ একটু জোরে এগোয়, কোথাও একটু আস্তে, কিন্তু নিজের অক্ষে ঘোরে সমান গতিতে। গতির এই এগোনো-পেছানোর কারণে কোনো কোনো সময় ডান বা বাম কিনারার আড়ালের অংশটুকু চোখে পড়ে।
দ্বিতীয় কারণ, চাঁদের অক্ষ কক্ষপথের সঙ্গে ঠিক লম্বভাবে নেই, প্রায় ৬.৭ ডিগ্রি হেলে আছে। এই হেলানোর কারণে কখনো উত্তর প্রান্তের, কখনো দক্ষিণ প্রান্তের খানিকটা অতিরিক্ত অংশ দেখা যায়।
নিজে লক্ষ করলেও এই দুলুনির আভাস পাওয়া যায়। মাসের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পূর্ণ চাঁদের কিনারার দিকে তাকালে দেখা যাবে, কিনারার কাছের কোনো গাঢ় অংশ বা গহ্বর কোনো সময় একদম ধারে, আবার কোনো সময় কিছুটা ভেতরে সরে এসেছে। এই সরে যাওয়াটুকুই লিব্রেশনের দৃশ্যমান চিহ্ন, যা ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণে খালি চোখেও ধরা দেয়।
সব মিলিয়ে, কোনো এক মুহূর্তে আমরা চাঁদের অর্ধেকটাই দেখতে পাই। কিন্তু মাস ও বছরজুড়ে পর্যবেক্ষণ যোগ করলে মোট দেখা যায় প্রায় ৫৯ শতাংশ, অর্থাৎ কঠোর অর্ধেকের চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।
অপর পাশ মানেই অন্ধকার পাশ নয়
চাঁদের অপর পাশকে অনেকে অন্ধকার পাশ বলে থাকেন, এই ধারণা ঠিক নয়। অপর পাশে সূর্যের আলো আমাদের পাশের মতোই পড়ে, সেখানেও নিয়মিত দিন ও রাত হয়। পার্থক্য শুধু একটাই, সেই পাশটি পৃথিবীর দিকে কখনো ফেরে না।
পূর্ণিমার রাতে আমাদের পাশ পুরো আলোকিত থাকে, তখন অপর পাশে থাকে রাত। আবার অমাবস্যায় অবস্থা উল্টো, অপর পাশ পুরো আলোয় ভাসে, আর আমাদের পাশ থাকে অন্ধকারে।
অপর পাশটি মানুষ প্রথম দেখে অনেক পরে, মহাকাশযানের কল্যাণে। ১৯৫৯ সালের ৭ অক্টোবর সোভিয়েত মহাকাশযান লুনা ৩ (Luna 3) চাঁদের পেছন দিয়ে ঘুরে এসে প্রথমবার সেই পাশের ছবি তোলে। ছবিতে দেখা যায়, অপর পাশে আমাদের পাশের মতো বড় বড় গাঢ় সমভূমি অনেক কম, বরং গহ্বর আর খাঁজে ভরা ভূখণ্ড সেখানে বেশি।
তার আগের পুরো মানব ইতিহাসে কেউ কখনো সেই পাশটি দেখেনি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনেকে ধারণা করতেন, অপর পাশ দেখতে কাছের পাশের মতোই হবে। ছবি হাতে পাওয়ার পর সেই ধারণা বদলে যায়, কারণ গাঢ় সমভূমির অভাব আর গহ্বরের আধিক্য দুটি পাশকে স্পষ্ট আলাদা করে দেয়।
এক নজরে মূল তথ্যগুলো
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| চাঁদের একবার ঘূর্ণনের সময় | প্রায় ২৭.৩ দিন |
| পৃথিবীকে একবার পরিক্রমণের সময় | প্রায় ২৭.৩ দিন |
| ঘটনাটির নাম | টাইডাল লকিং |
| এক মুহূর্তে দেখা যায় | মোট পৃষ্ঠের অর্ধেক |
| সময়ের সঙ্গে মোট দেখা যায় | প্রায় ৫৯ শতাংশ |
| বেশি দেখা যাওয়ার কারণ | লিব্রেশন বা চাঁদের সামান্য দুলুনি |
| অপর পাশের প্রথম ছবি | লুনা ৩, ৭ অক্টোবর ১৯৫৯ |
| চাঁদের প্রতি বছর দূরে সরে যাওয়া | প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার |
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চাঁদ কি সত্যিই নিজের অক্ষে ঘোরে না?
ঘোরে, পুরো একবার পরিক্রমণের সময়ে ঠিক একবার। ঘূর্ণন ও পরিক্রমণের গতি সমান বলেই ঘূর্ণনটা চোখে ধরা পড়ে না, আর পাশও বদলায় না।
চাঁদের অপর পাশে কি কখনোই আলো পড়ে না?
পড়ে, নিয়মিতই পড়ে। অমাবস্যার সময় অপর পাশ সম্পূর্ণ আলোকিত থাকে, শুধু সেই আলোকিত রূপটি পৃথিবী থেকে দেখা যায় না।
পূর্ণিমা হয় প্রায় ২৯.৫ দিন পরপর, তাহলে ঘূর্ণন ২৭.৩ দিন কেন?
কারণ চাঁদ পৃথিবীকে ঘোরার পাশাপাশি পৃথিবী নিজেও সূর্যের চারদিকে এগিয়ে যায়। ফলে আগের আলোর অবস্থায় ফিরতে চাঁদকে কিছুটা অতিরিক্ত পথ যেতে হয়, তাই পূর্ণিমা থেকে পূর্ণিমা হতে লাগে প্রায় ২৯.৫ দিন।