Skip to main content

Jante Hobe

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

সর্বশেষ লেখা

বৃষ্টি হয় পানিচক্রের কারণে। সূর্যের তাপে সাগর, নদী ও মাটির পানি বাষ্প হয়ে ওপরে ওঠে, ওপরের ঠান্ডা বাতাসে তা ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে, আর মেঘের ফোঁটা ভারী হলে বৃষ্টি হয়ে নিচে নেমে আসে। অর্থাৎ আকাশ থেকে যে পানি পড়ে, তা নতুন কোনো পানি নয়, পৃথিবীর নিজের পানিই ওপরে উঠে আবার ফিরে আসে।

পানিচক্র কী

পানিচক্র (Water Cycle) হলো পৃথিবীর পানির অবিরাম ঘোরাফেরা। ভূপৃষ্ঠের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে, মেঘ হয়ে দূরে ভেসে যায়, বৃষ্টি হয়ে মাটিতে নামে, তারপর নদী বেয়ে আবার সাগরে ফিরে যায়। এই চক্রের কোনো শুরু নেই, শেষও নেই, এটি চলতেই থাকে।

এই পুরো চক্রের চালিকাশক্তি হলো সূর্যের তাপ। সূর্য না থাকলে পানি বাষ্প হতো না, মেঘ তৈরি হতো না, বৃষ্টিও নামত না। NOAA-এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট পানির ৯৬ শতাংশের বেশি রয়েছে সাগরে। তাই পানিচক্রের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হলো সাগর, সেখান থেকেই সবচেয়ে বেশি পানি বাষ্প হয়ে ওঠে।

একটি বিষয় জেনে রাখা ভালো। পৃথিবীতে পানির মোট পরিমাণ প্রায় একই থাকে, কারণ পানি সাধারণত তৈরি হয় না বা ধ্বংসও হয় না। আজ যে বৃষ্টি নামছে, সেই পানির অণু হয়তো কোনো একদিন ডাইনোসোরের যুগের সাগরেও ছিল। পানি শুধু রূপ বদলায় আর জায়গা বদলায়, কখনো তরল, কখনো বাষ্প, কখনো বরফ।

ধাপ ১: বাষ্পীভবন, পানি ওপরে ওঠে

পানিচক্রের প্রথম ধাপ বাষ্পীভবন (Evaporation), অর্থাৎ সূর্যের তাপে তরল পানি গ্যাসীয় জলীয় বাষ্পে বদলে যাওয়া। জলীয় বাষ্প চোখে দেখা যায় না, এটি বাতাসের চেয়ে হালকা, তাই ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যায়। সাগর, নদী, পুকুর, ভেজা মাটি, সব জায়গা থেকেই এই বাষ্প ওঠে।

গাছপালাও এই ধাপে বড় ভূমিকা রাখে। গাছ শিকড় দিয়ে মাটি থেকে পানি টেনে নেয়, আর সেই পানির একটি অংশ পাতা থেকে বাষ্প আকারে বাতাসে বেরিয়ে যায়। একে বলে প্রস্বেদন (Transpiration), অর্থাৎ গাছের পাতা দিয়ে পানি বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যাওয়া। বনাঞ্চলের ওপরে আর্দ্র বাতাস ও মেঘ বেশি দেখা যাওয়ার একটি কারণ এই প্রস্বেদন।

দৈনন্দিন জীবনেও আপনি বাষ্পীভবন রোজ দেখেন। ধোয়া কাপড় রোদে শুকিয়ে যাওয়া, গোসলের পর শরীরের পানি মুছে যাওয়া, ঘাম শুকিয়ে যাওয়া, এসবই বাষ্পীভবন। শুধু প্রকৃতিতে ঘটনাটি ঘটে বিশাল আকারে, গোটা সাগর ও ভূমিজুড়ে।

ধাপ ২: ঘনীভবন, মেঘের জন্ম

ভূপৃষ্ঠের কাছের বাতাস তুলনামূলক গরম থাকে, কিন্তু যত ওপরে ওঠা যায়, বাতাস তত ঠান্ডা হয়। জলীয় বাষ্প ওপরে উঠে ঠান্ডা হলে তার আচরণ বদলে যায়। বাষ্প তখন আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরল পানির ফোঁটায় পরিণত হতে শুরু করে, এই প্রক্রিয়ার নাম ঘনীভবন (Condensation)।

তবে ফোঁটা তৈরি হওয়ার জন্য একটি শর্ত আছে। NASA-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জলীয় বাষ্পকে আঁকড়ে ধরার মতো একটি ক্ষুদ্র কণা লাগে, যেমন ধুলো, লবণের কণা বা ফুলের পরাগ। এই কণাগুলোকে বলা হয় ঘনীভবন কেন্দ্র (Condensation Nuclei), অর্থাৎ যেসব অতি ক্ষুদ্র কণার গায়ে লেগে বাষ্প ফোঁটায় পরিণত হয়। কোটি কোটি এমন ফোঁটা একসঙ্গে জমা হলেই আমরা তা মেঘ হিসেবে দেখি।

ঘনীভবনের ছোট একটি উদাহরণ আপনি ফ্রিজের বোতলেই দেখতে পান। ঠান্ডা পানীয়ের বোতল বাইরে রাখলে তার গায়ে পানির ফোঁটা জমে। বোতলের ভেতরের পানি বাইরে আসেনি, বাতাসের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা গায়ে লেগে ঘনীভূত হয়েছে। মেঘও ঠিক এভাবেই তৈরি, শুধু সেখানে ঠান্ডা গা হলো ওপরের শীতল বাতাস আর কণা।

ধাপ ৩: ফোঁটা বড় হয়, বৃষ্টি নামে

মেঘের শুরু দিকের ফোঁটাগুলো আকারে অত্যন্ত ছোট ও হালকা থাকে। মেঘের ভেতরের ঊর্ধ্বমুখী বাতাস সেগুলোকে সহজেই ভাসিয়ে রাখে, তাই মেঘ আকাশে ভেসে থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে ফোঁটাগুলোর ওপর আরও বাষ্প ঘনীভূত হতে থাকে।

NOAA-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফোঁটাগুলো বড় হওয়ার আরেকটি উপায় হলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে লেগে যাওয়া। ছোট ফোঁটা বড় ফোঁটার সঙ্গে মিশে আরও বড় হয়, এভাবে ফোঁটার আকার বাড়তেই থাকে। এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে ফোঁটা একসময় এতটা ভারী হয়ে যায় যে ঊর্ধ্বমুখী বাতাস আর তাকে ধরে রাখতে পারে না। তখন অভিকর্ষের টানে ফোঁটাটি নিচের দিকে পড়তে শুরু করে, এটাই বৃষ্টি।

পড়ার পথে বাতাসের তাপমাত্রা অনুযায়ী বৃষ্টির রূপ বদলাতে পারে। মেঘ থেকে মাটি পর্যন্ত পুরো পথের বাতাস বরফশীতল হলে ফোঁটা তুষার বা শিলা আকারে পড়তে পারে। ওপরের অংশ ঠান্ডা কিন্তু নিচের বাতাস গরম হলে বরফ গলে গিয়ে বৃষ্টি হয়েই নামে। বাংলাদেশের মতো গরম দেশে প্রায় সব বৃষ্টিই তরল পানি আকারে আসে।

সব মেঘ থেকেই বৃষ্টি হয় না। অনেক মেঘের ফোঁটা যথেষ্ট বড় হওয়ার সুযোগ পায় না, তার আগেই মেঘ শুষ্ক বাতাসে মিশে আবার বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যায়। বৃষ্টি হতে হলে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা, ফোঁটা বাড়ার সময় এবং সঠিক বাতাসের গতি, তিনটিই একসঙ্গে দরকার হয়।

বৃষ্টির পর পানি কোথায় যায়

মাটিতে নামা বৃষ্টির পানি কয়েকটি পথে ভাগ হয়ে যায়। একটি অংশ মাটির ভেতরে চুইয়ে নিচে নেমে ভূগর্ভস্থ পানি হিসেবে জমা হয়, যেখান থেকে আমরা নলকূপে পানি তুলি। আরেকটি অংশ মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে খাল, বিল ও নদী হয়ে সাগরের দিকে রওনা হয়। বাকি অংশ গাছপালা ও প্রাণী ব্যবহার করে, আবার কিছু পানি সেদিনই বাষ্প হয়ে ফিরে যায়।

এরপর আবার শুরু হয় একই গল্প। সাগর ও নদীর পানি বাষ্প হয়, মেঘ হয়, বৃষ্টি নামে। এই কারণেই একে চক্র বলা হয়, পানি থামে না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে ঘুরতেই থাকে।

রান্নাঘরের উদাহরণে পুরো বিষয়টি

বিষয়টি সহজে বুঝতে একটি রান্নাঘরের দৃশ্য ভাবুন। হাঁড়িতে পানি ফুটলে সাদা ধোঁয়ার মতো বাষ্প ওঠে, সেটি বাষ্পীভবনের ছোট রূপ। এবার হাঁড়ির ওপর ঠান্ডা একটি ঢাকনা ধরলে দেখবেন, কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকনার নিচে পানির ফোঁটা জমে গেছে। বাষ্প ঠান্ডা পৃষ্ঠ পেয়ে ঘনীভূত হয়েছে, এটাই ঘনীভবন। আরেকটু অপেক্ষা করলে ফোঁটাগুলো বড় হয়ে ঢাকনা বেয়ে গড়িয়ে হাঁড়িতে পড়ে, সেটাই বৃষ্টি।

প্রকৃতিতেও একই ঘটনা ঘটে, শুধু মঞ্চটি বিশাল। সাগর ও নদী হলো হাঁড়ির পানি, সূর্য হলো চুলা, আর আকাশের ওপরের ঠান্ডা বাতাস হলো সেই ঢাকনা। পার্থক্য শুধু আকারে, প্রক্রিয়ায় কোনো পার্থক্য নেই। পরের বার বৃষ্টি নামলে মনে রাখতে পারেন, আকাশে কোথাও এক প্রকাণ্ড হাঁড়ির ঢাকনা থেকে ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।

এক নজরে বৃষ্টির প্রক্রিয়া

পানিচক্রের ধাপগুলো এক নজরে
ধাপ কী ঘটে প্রকৃতিতে দেখা যায়
বাষ্পীভবন সূর্যের তাপে তরল পানি জলীয় বাষ্প হয় সাগর, নদী, পুকুর ও ভেজা মাটি থেকে বাষ্প ওঠা
প্রস্বেদন গাছের পাতা থেকে পানি বাষ্প আকারে বেরোয় বনাঞ্চলের ওপর আর্দ্র বাতাস ও ঘন মেঘ
ঘনীভবন ঠান্ডায় বাষ্প ক্ষুদ্র কণায় লেগে ফোঁটা হয় মেঘ তৈরি হওয়া
বৃষ্টিপাত ফোঁটা ভারী হলে অভিকর্ষের টানে নিচে পড়ে বৃষ্টি, তুষার, শিলাবৃষ্টি
সংগ্রহ পানি নদী, সাগর ও ভূগর্ভে জমা হয় নদীর প্রবাহ, নলকূপের পানি

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সাগরের পানি লবণাক্ত, কিন্তু বৃষ্টির পানি লবণাক্ত নয় কেন?

বাষ্পীভবনের সময় শুধু পানির অণু ওপরে ওঠে, লবণ ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ সাগরেই পড়ে থাকে। জলীয় বাষ্পে লবণ থাকে না, তাই সেই বাষ্প থেকে তৈরি বৃষ্টির পানিও মিঠা হয়।

মেঘ থাকলেই বৃষ্টি হয় না কেন?

কারণ শুধু মেঘ থাকাই যথেষ্ট নয়, ফোঁটাগুলোকে বৃষ্টি হয়ে পড়ার মতো বড় ও ভারী হতে হয়। ফোঁটা ছোট থাকলে বাতাস সেগুলো ভাসিয়ে রাখে, আর অনেক মেঘ ফোঁটা বড় হওয়ার আগেই শুষ্ক বাতাসে মিলিয়ে যায়।

বৃষ্টির আগে মেঘ কালো দেখায় কেন?

বৃষ্টির মেঘ সাধারণত ঘন ও পুরু হয়। এতে ফোঁটার সংখ্যা এত বেশি থাকে যে সূর্যের আলোর বড় একটি অংশ মেঘের ভেতরেই আটকে যায় বা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মেঘের নিচের দিকে আলো কম পৌঁছায়, আর সেটি আমাদের চোখে ধূসর বা কালো দেখায়।