ফিরনি মুঘল আমল থেকে চলে আসা একটি রাজকীয় মিষ্টি পদ। পায়েসের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, ফিরনিতে আস্ত চালের বদলে আধভাঙা গুঁড়া করা চাল ব্যবহার করা হয়, ফলে গড়ন হয় মসৃণ ও ঘন, অনেকটা কাস্টার্ডের মতো। জাফরান, এলাচ আর মাওয়ার সংযোজনে তৈরি শাহী ফিরনি ঈদের সকালে, বিয়ের শেষ পাতে আর বিশেষ দাওয়াতে ঠান্ডা মাটির বাটিতে পরিবেশন করা হয়।
প্রস্তুতির সময়: ১৫ মিনিট, চাল ভিজিয়ে রাখা আলাদা ১ ঘণ্টা
রান্নার সময়: ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট
পরিবেশন: ৬ জন (ছোট মাটির বাটিতে)
উপকরণ
| উপকরণ | পরিমাণ |
|---|---|
| মূল উপকরণ | |
| দুধ (ফুল ফ্যাট) | ১ লিটার |
| আতপ চাল বা গোবিন্দভোগ চাল | ৭৫ গ্রাম |
| চিনি | আধা কাপ (প্রায় ১০০ গ্রাম) |
| মাওয়া বা খোয়া ক্ষীর (ঝুরি করা) | ১০০ গ্রাম |
| ছোট এলাচ গুঁড়া | আধা চা চামচ |
| জাফরান | এক চিমটি |
| ঈষদুষ্ণ দুধ (জাফরান ভিজানোর জন্য) | ২ টেবিল চামচ |
| কেওড়া জল | ১ চা চামচ |
| ঘি | ১ চা চামচ |
| লবণ | এক চিমটি |
| সাজানোর জন্য | |
| পেস্তা বাদাম কুচি | ১ টেবিল চামচ |
| কাঠবাদাম কুচি | ১ টেবিল চামচ |
| কিশমিশ (ঐচ্ছিক) | ১ টেবিল চামচ |
প্রস্তুত প্রণালি
১. চাল ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার পানিতে ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন।
২. ভিজানো চালের পানি ঝরিয়ে মিক্সার বা শিলপাটায় আধভাঙা করে বেটে নিন। গুঁড়া যেন সুজির মতো দানাদার থাকে, ময়দার মতো মিহি করা যাবে না।
৩. ছোট বাটিতে ঈষদুষ্ণ দুধে জাফরান ভিজিয়ে রাখুন।
৪. মাটির বাটিগুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখুন, যাতে পরিবেশনের সময় বাটি অতিরিক্ত আর্দ্রতা টেনে না নেয়।
৫. ভারী তলার হাঁড়িতে দুধ ঢেলে মাঝারি আঁচে ফুটিয়ে নিন। ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে ৮ থেকে ১০ মিনিট জ্বাল দিন, মাঝে মাঝে নেড়ে দিন যেন তলায় সর পড়ে আটকে না যায়।
৬. বাটা চাল অল্প ঠান্ডা দুধ বা পানিতে গুলে পাতলা মিশ্রণ বানিয়ে নিন।
৭. গুলে রাখা চাল ধীরে ধীরে ফুটন্ত দুধে ঢালুন এবং একই সঙ্গে অনবরত নাড়তে থাকুন, যেন দলা না পাকায়।
৮. মৃদু আঁচে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রান্না করুন। সারা সময় নিয়মিত নাড়তে হবে, গুঁড়া চাল তলায় বসে সহজে লেগে যায়।
৯. চাল পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে মিশ্রণ ঘন হয়ে এলে ঝুরি করা মাওয়া দিয়ে ভালো করে মেলান, গোটা থাকলে ভেঙে দিন।
১০. চিনি ও এক চিমটি লবণ দিয়ে আরও ৫ মিনিট নাড়তে থাকুন। চিনি গলে গেলে মিশ্রণ কিছুটা পাতলা হবে, তারপর আবার ঘন হবে।
১১. ভিজিয়ে রাখা জাফরান-দুধ, এলাচ গুঁড়া, ঘি ও কেওড়া জল দিয়ে মিশিয়ে চুলা বন্ধ করে দিন।
১২. গরম ফিরনি ভিজিয়ে রাখা মাটির বাটিতে ঢেলে ওপরে পেস্তা ও কাঠবাদাম কুচি ছড়িয়ে দিন।
১৩. ঘরের তাপমাত্রায় ঠান্ডা হলে বাটিগুলো ঢেকে ফ্রিজে অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা রাখুন। ভালো করে জমে ঠান্ডা হলে পরিবেশন করুন।
টিপস
চালের গুঁড়ার গড়নই ফিরনির প্রাণ। বেশি মিহি করে বাটলে ফিরনি আঠালো ও ভারী হয়ে যায়, আবার খুব মোটা দানা থাকলে মুখে কাঁচা লাগে। সুজির মতো দানাদার গুঁড়াই সঠিক মাপ।
চালের মিশ্রণ দুধে দেওয়ার মুহূর্তে নাড়া থামানো যাবে না। প্রথম কয়েক মিনিটেই দলা পাকানোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে, তাই এক হাতে ঢেলে অন্য হাতে নাড়তে হয়।
ফিরনি ঠান্ডা হলে আরও ঘন হয়ে জমে, এই হিসাব ধরে চুলা থেকে নামাতে হয়। চামচের পিঠে আঙুল টানলে দাগ থেকে গেলে এবং দুই পাশ মিলতে দেরি হলে বুঝতে হবে ঘনত্ব ঠিক হয়েছে। হাঁড়িতে পায়েসের মতো পাতলা মনে হলেও বাটিতে জমে তা ঠিকঠাক হবে।
মাওয়া না পাওয়া গেলে গুঁড়া দুধ ৩ টেবিল চামচ অল্প দুধে গুলে বিকল্প হিসেবে দেওয়া যায়, তবে আসল শাহী স্বাদের জন্য খোয়া ক্ষীরই সেরা। চিনির পরিমাণ দুধের ঘনত্ব অনুযায়ী সামান্য কমবেশি হতে পারে, মিষ্টি কম পছন্দ হলে প্রথমে কম দিয়ে স্বাদ দেখে নেওয়া ভালো।
নতুন মাটির বাটি ব্যবহারের আগে অন্তত আধা ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। শুকনো বাটিতে ফিরনি ঢাললে বাটি ঝোল শুষে নিয়ে ওপরের অংশ শুকনো করে ফেলতে পারে।
পরিবেশন ও সংরক্ষণ
ফিরনি সব সময় ঠান্ডা পরিবেশন করা হয়, ভোজের শেষে মাটির বাটিসহই টেবিলে দেওয়া ঐতিহ্য। ঢাকা অবস্থায় ফ্রিজে ২ থেকে ৩ দিন ভালো থাকে। ফ্রিজ থেকে বের করে সরাসরি পরিবেশন করা যায়, আবার গরম করার কোনো প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিন রেখে দিলে ওপরে চামড়ার মতো সর পড়তে পারে, পরিবেশনের আগে তা চামচ দিয়ে তুলে ফেললেই হবে।