Skip to main content

Jante Hobe

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

সর্বশেষ লেখা

ইন্টারনেট হলো সারা বিশ্বের অসংখ্য নেটওয়ার্কের পারস্পরিক সংযোগ, যেখানে আপনার চাওয়া তথ্য ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ হয়ে রাউটারের হাত ঘুরে গন্তব্যের কম্পিউটারে পৌঁছায় এবং সেখানে আবার জোড়া লেগে মূল তথ্য হয়ে ওঠে। এই বিশাল ব্যবস্থার মালিক কোনো একক কোম্পানি বা দেশ নয়। অভিন্ন কিছু নিয়ম মেনে সবাই যুক্ত আছে বলেই এটি কাজ করে।

ইন্টারনেট আসলে কী

ইন্টারনেট (Internet) মানে হলো নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক। আপনার বাসার যন্ত্রগুলো ওয়াই-ফাই দিয়ে একটি ছোট নেটওয়ার্ক তৈরি করে। আপনার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক তার চেয়ে অনেক বড়। এমন হাজার হাজার নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েই গোটা ইন্টারনেট গড়ে উঠেছে। একটি নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হলেও অন্য পথে তথ্য চলতে পারে, এই যুক্ত থাকার গঠনই ইন্টারনেটের শক্তি।

একটি ভুল ধারণা এখানে ভেঙে দেওয়া দরকার। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (World Wide Web) আর ইন্টারনেট এক জিনিস নয়। ওয়েব হলো ইন্টারনেটের ওপর চলা একটি সেবা, যেখানে আমরা ওয়েবসাইট দেখি। ইমেইল, ভিডিও কল বা অনলাইন গেমও ইন্টারনেটের ওপর চলা আলাদা আলাদা সেবা, যেমন একই রেললাইনের ওপর নানা ধরনের ট্রেন চলে।

কেউ একা ইন্টারনেট চালায় না, তবে সবাই কথা বলে অভিন্ন নিয়মে। যন্ত্রগুলো কোন ভাষায়, কোন সাজে তথ্য পাঠাবে, সেই নিয়মকানুনকে বলা হয় প্রোটোকল (Protocol)। ইন্টারনেটের মূল নিয়মজুটির নাম টিসিপি/আইপি (TCP/IP), যা ঠিক করে তথ্য কীভাবে ভাগ হবে, ঠিকানা লেখা হবে এবং অপর প্রান্তে আবার জোড়া লাগবে।

প্রতিটি যন্ত্রের নিজস্ব ঠিকানা: আইপি অ্যাড্রেস

ইন্টারনেটে যুক্ত প্রতিটি যন্ত্রের একটি করে আইপি অ্যাড্রেস (IP Address) থাকে, অর্থাৎ সংখ্যা দিয়ে লেখা এমন ঠিকানা, যা দেখে বোঝা যায় তথ্য কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাবে। Cloudflare-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তথ্যের প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে এই ঠিকানার তথ্য জুড়ে দেওয়া থাকে, যাতে পথের যন্ত্রগুলো সেটিকে সঠিক জায়গায় পাঠাতে পারে। ঠিকানাটি দেখতে অনেকটা এমন হয়, 192.0.2.1 জাতীয় সংখ্যার সারি।

বাসার সংযোগের ক্ষেত্রে এই ঠিকানা সাধারণত আপনার ইন্টারনেট সেবাদাতাই বরাদ্দ করে। অনেক সংযোগে ঠিকানাটি স্থায়ী থাকে না, নতুন করে যুক্ত হলে তা বদলেও যেতে পারে। মোবাইল ফোন যখন মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে, তখন সেটিও অপারেটরের দেওয়া একটি ঠিকানা নিয়েই ইন্টারনেটে কথা বলে।

তথ্য যায় টুকরো হয়ে: প্যাকেট

আপনি একটি ছবি বা ফাইল পাঠালে তা পুরোটা একসঙ্গে যাত্রা করে না। তথ্য প্রথমে ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ হয়ে যায়, যেগুলোকে বলা হয় প্যাকেট (Packet), অর্থাৎ গন্তব্য ও প্রেরকের ঠিকানা লেখা তথ্যের ছোট অংশ। প্রতিটি প্যাকেট আলাদাভাবে যাত্রা করে, এমনকি একই ফাইলের দুটি প্যাকেট ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়েও যেতে পারে।

গন্তব্যে পৌঁছানোর পর প্যাকেটগুলো সঠিক ক্রমে আবার জোড়া লেগে মূল ছবি বা পেজ তৈরি হয়। টিসিপি (TCP) এই অংশটি দেখভাল করে, কোনো প্যাকেট পথে হারিয়ে গেলে তা আবার পাঠানোর ব্যবস্থা করে এবং ক্রম ঠিক রাখে। ফলে মাঝপথে একটি প্যাকেট দেরি করলেও আপনার ছবি অর্ধেক হয়ে থাকে না, পুরোটাই পৌঁছায়।

রাউটার: মোড়ে মোড়ে দিকনির্দেশক

প্যাকেটের এই দীর্ঘ যাত্রায় পথ দেখানোর কাজটি করে রাউটার (Router), অর্থাৎ এমন যন্ত্র, যা প্যাকেটের গায়ে লেখা গন্তব্য ঠিকানা দেখে সেটিকে পরের সঠিক পথে পাঠিয়ে দেয়। আপনার বাসার ছোট রাউটার থেকে শুরু করে বড় বড় নেটওয়ার্কের শক্তিশালী রাউটার পর্যন্ত, প্যাকেট ধাপে ধাপে এক রাউটার থেকে আরেক রাউটারে এগিয়ে যায়।

প্রতিটি রাউটারের কাছে নিজের এলাকার পথের একটি তালিকা থাকে। প্যাকেট এলে রাউটার ঠিকানা মিলিয়ে দেখে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, কোন দিকে পাঠালে গন্তব্যের কাছাকাছি যাওয়া যাবে। কোনো পথে যানজট বা ত্রুটি থাকলে প্যাকেট অন্য পথ দিয়েও যেতে পারে। এই নমনীয়তার কারণেই কোনো একটি কেবল ছিঁড়লেও ইন্টারনেট পুরোপুরি থেমে যায় না।

আইএসপি: আপনার দরজা থেকে বিশ্বের পথ

আইএসপি (ISP, Internet Service Provider) হলো সেই কোম্পানি, যারা আপনাকে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। আপনার বাসার ফাইবার বা কেবল সংযোগ প্রথমে আইএসপির নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়, সেখান থেকে তথ্য বড় নেটওয়ার্ক ও দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যায়। মোবাইল ডেটার ক্ষেত্রে এই ভূমিকাটি পালন করে আপনার মোবাইল অপারেটর।

ওয়াই-ফাই নিয়ে একটি বিভ্রান্তিও এখানে কাটে। ওয়াই-ফাই শুধু আপনার যন্ত্র থেকে বাসার রাউটার পর্যন্ত তারবিহীন সংযোগ, এর বেশি কিছু নয়। আইএসপির সংযোগ বন্ধ থাকলে ওয়াই-ফাই চালু দেখালেও কোনো ওয়েবসাইট খুলবে না। অর্থাৎ ওয়াই-ফাই হলো ঘরের ভেতরের সিঁড়ি, আর ইন্টারনেটে যাওয়ার আসল দরজা হলো আইএসপির সংযোগ।

নাম থেকে ঠিকানা খোঁজা: ডিএনএস

মানুষ নাম মনে রাখতে পারে, কিন্তু কম্পিউটার বোঝে সংখ্যার ঠিকানা। আপনি ব্রাউজারে একটি ওয়েবসাইটের নাম লিখলে প্রথম কাজ হয় সেই নামের আইপি ঠিকানা বের করা। এই কাজটি করে ডিএনএস (DNS, Domain Name System), অর্থাৎ ওয়েবসাইটের নামকে তার সংখ্যাগত ঠিকানায় বদলে দেওয়ার ব্যবস্থা।

Cloudflare এই ব্যবস্থাকে ইন্টারনেটের ফোনবুক বলেছে। ফোনবুকে যেমন নাম দেখে নম্বর বের করা হয়, ডিএনএসও তেমনই নাম দেখে ঠিকানা জানিয়ে দেয়। আপনার যন্ত্রের জিজ্ঞাসা প্রথমে একটি ডিএনএস সার্ভারের কাছে যায়, প্রয়োজনে সে আরও কয়েকটি সার্ভারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে আসল ঠিকানাটি সংগ্রহ করে আনে। এই পুরো খোঁজাখুঁজি ঘটে চোখের পলকে, আড়ালে, আর ঠিকানা হাতে পেলেই ব্রাউজার আসল সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।

একটি ওয়েবপেজ খুললে যা যা ঘটে

এবার পুরো প্রক্রিয়াটি একটানা ধাপে দেখুন। প্রথমে, আপনি ব্রাউজারে ওয়েবসাইটের নাম লিখলেন। ডিএনএস সেই নামের আইপি ঠিকানা বের করে দিল।

দ্বিতীয় ধাপে, ব্রাউজারের অনুরোধ প্যাকেট আকারে বাসার রাউটার পেরিয়ে আইএসপির নেটওয়ার্কে ঢুকল, সেখান থেকে একের পর এক রাউটার ঘুরে পৌঁছে গেল ওয়েবসাইটের সার্ভারে। সার্ভার (Server) হলো সেই সবসময় চালু থাকা কম্পিউটার, যেখানে ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি ও ফাইল রাখা থাকে।

তৃতীয় ধাপে, সার্ভার পেজের তথ্য প্যাকেটে ভাগ করে একইভাবে ফেরত পাঠাল। ফিরে আসা প্যাকেটগুলো আপনার যন্ত্রে জোড়া লাগতেই পর্দায় পুরো পেজ ফুটে উঠল। ঠিকানায় https থাকলে এই যাতায়াতের তথ্য সাংকেতিক আকারে থাকে, যাতে মাঝপথে কেউ তা সহজে পড়তে না পারে। কাছের সার্ভার হলে পুরো ঘটনাটি ঘটে এক সেকেন্ডেরও অনেক কম সময়ে।

মহাদেশ পেরিয়ে ডেটা যায় সাগরের তল দিয়ে

দেশের ভেতরে তথ্য চলে ফাইবার অপটিক (Fiber Optic) কেবল দিয়ে, অর্থাৎ কাচের সূক্ষ্ম তন্তু, যার ভেতর দিয়ে তথ্য আলোর সংকেত আকারে ছুটে যায়। কিন্তু মহাদেশ থেকে মহাদেশে যাওয়ার প্রধান পথটি স্যাটেলাইট নয়, সাগরের তলদেশে বিছানো বিশাল ফাইবার অপটিক কেবল। বিশেষ কেবল-বিছানো জাহাজ এই কেবলগুলো সাগরতলে বিছায় এবং নষ্ট হলে মেরামত করে।

TeleGeography ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থা ITU-এর হিসাব অনুযায়ী, আন্তঃমহাদেশীয় ডেটা চলাচলের ৯৯ শতাংশের বেশি যায় এই সাগরতলের কেবল দিয়ে। কারণ স্যাটেলাইটের তুলনায় কেবলে একসঙ্গে অনেক বেশি তথ্য, অনেক কম দেরিতে পাঠানো যায়। একটি কেবল ছিঁড়ে গেলে তথ্য সাধারণত অন্য কেবল বা বিকল্প পথে ঘুরিয়ে পাঠানো হয়, তাই ব্যবহারকারী অনেক সময় বিষয়টি টেরও পান না।

ডাকঘরের উদাহরণে পুরো বিষয়টি

পুরো ব্যবস্থাটি একটি বিশাল ডাক সেবার সঙ্গে মিলিয়ে ভাবুন। প্যাকেট হলো খাম, যার গায়ে প্রেরক ও প্রাপকের ঠিকানা লেখা থাকে। আইপি অ্যাড্রেস হলো সেই ঠিকানাই। রাউটার হলো পথের প্রতিটি বাছাইঘর, যারা ঠিকানা দেখে খামটি পরের সঠিক ডাকঘরের দিকে পাঠিয়ে দেয়।

ডিএনএস হলো সেই ঠিকানার খাতা, যেখানে মানুষের নাম দেখে আসল নম্বর-ঠিকানা বের করা হয়। আর আইএসপি হলো আপনার এলাকার ডাকঘর, যার মাধ্যমে আপনার সব চিঠি এই বিশাল ব্যবস্থায় ঢোকে, আবার ফিরেও আসে। বড় পার্সেল যেমন ওজনের কারণে কয়েকটি ভাগে পাঠিয়ে ওপারে আবার জোড়া দেওয়া হয়, বড় ফাইলও তেমনই প্যাকেটে ভাগ হয়ে যাত্রা করে।

এক নজরে ইন্টারনেটের অংশগুলো

ইন্টারনেট যেভাবে কাজ করে, এক নজরে
অংশ কাজ
ডিএনএস ওয়েবসাইটের নামকে আইপি ঠিকানায় বদলে দেয়
আইপি অ্যাড্রেস প্রতিটি যন্ত্রের সংখ্যা দিয়ে লেখা পরিচয়-ঠিকানা
প্যাকেট তথ্যের ছোট খণ্ড, গায়ে গন্তব্যের ঠিকানা লেখা থাকে
রাউটার ঠিকানা দেখে প্যাকেটকে পরের সঠিক পথে পাঠায়
আইএসপি আপনার সংযোগকে বিশ্বের নেটওয়ার্কে যুক্ত করে
সার্ভার ওয়েবসাইটের তথ্য রাখে ও অনুরোধ পেলে পাঠিয়ে দেয়
সাবমেরিন কেবল সাগরতল দিয়ে মহাদেশের মধ্যে ডেটা বয়ে নেয়

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ওয়াই-ফাই আর ইন্টারনেট কি একই জিনিস?
না। ওয়াই-ফাই হলো বাসার ভেতরে তার ছাড়া যন্ত্র যুক্ত করার একটি পদ্ধতি মাত্র। ইন্টারনেট আসে আইএসপির সংযোগ দিয়ে, সেই সংযোগ না থাকলে ওয়াই-ফাই সংকেত থাকলেও কোনো ওয়েবসাইট খুলবে না।

ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি আসলে কোথায় থাকে?
সার্ভার নামের বিশেষ কম্পিউটারে। এগুলো দিনরাত চালু থাকে এবং কারো অনুরোধ পেলেই চাওয়া তথ্য প্যাকেট আকারে পাঠিয়ে দেয়। বড় ও জনপ্রিয় সাইটের সার্ভার পৃথিবীর নানা শহরে ছড়িয়ে থাকে, যাতে কাছের সার্ভার থেকে দ্রুত তথ্য পাওয়া যায়।

এত দূরের তথ্য এত দ্রুত আসে কীভাবে?
কারণ ফাইবার অপটিক কেবলে তথ্য আলোর সংকেত আকারে অত্যন্ত দ্রুত চলে, আর পথের রাউটারগুলো প্রতিটি ধাপে মুহূর্তের মধ্যে পথ বেছে নেয়। দূরত্ব বাড়লে সময় সামান্য বাড়ে বটে, কিন্তু সাধারণ কাজে সেই পার্থক্য টের পাওয়া কঠিন।