গণিত মুখস্থের বিষয় নয়, অভ্যাসের বিষয়। যে শিক্ষার্থী প্রতিদিন অঙ্ক কষে, সে পরীক্ষার হলে নতুন প্রশ্ন দেখেও ঘাবড়ায় না। এই লেখাটি এসএসসি গণিত প্রস্তুতির কৌশলের চিরসবুজ গাইড, শুধু সাজেশন তালিকা নয়। কোনো ফাঁস হওয়া প্রশ্ন, কোনো শতভাগ কমনের দাবি, কোনো ২০২৭ সালের পরীক্ষার তারিখ এই লেখায় নেই। এই পাতাটি বোর্ডের অফিশিয়াল পেজ নয়।
সতর্কতা: বোর্ড বা এনসিটিবির মূল নথি এই রিসার্চে সরাসরি পড়া যায়নি। নিচের কাঠামো ২০২৬ সালের ঢাকা বোর্ডের প্রশ্নপত্রের প্রতিবেদন ও গাইড পেজের ভিত্তিতে দেওয়া হলো। ২০২৭ সালের কাঠামো বদলাতে পারে, তাই নিজের স্কুল ও বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি মিলিয়ে নিন।
গণিতের নম্বর কাঠামো
বর্তমান কাঠামো: সৃজনশীল ৫০ (৫টি প্রশ্ন, প্রতিটি ১০), সংক্ষিপ্ত উত্তর ২০ (১০টি প্রশ্ন, প্রতিটি ২), বহুনির্বাচনি ৩০ (৩০টি প্রশ্ন, প্রতিটি ১), মোট ১০০। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্নের ভেতরের বিভাজন: ক অংশে ২, খ অংশে ৪, গ অংশে ৪। বহুনির্বাচনি অংশ প্রথমে হয়, তারপর লিখিত অংশ, মাঝে কোনো বিরতি নেই। পুরোনো কাঠামো সৃজনশীল ৭০ ও বহুনির্বাচনি ৩০ এখন আর বর্তমান নয়, তাই পুরোনো বই বা গাইডের কাঠামো দেখে প্রস্তুতি নেবেন না।
বীজগণিত: সবচেয়ে বেশি নম্বরের ভিত্তি
বীজগণিতের অধ্যায়গুলো: সেট ও ফাংশন, বীজগাণিতিক রাশি, সূচক ও লগ, সমীকরণ, অনুপাত, ধারা। সেট ও ফাংশনে ডোমেন, রেঞ্জ, ফাংশনের ধরন ভালো করে বুঝুন, কারণ এখান থেকে সৃজনশীল ও বহুনির্বাচনি দুই ধরনের প্রশ্নই আসে। সূচক ও লগের সূত্র মুখস্থ না করে প্রমাণসহ বুঝুন, তাহলে নতুন প্রশ্নেও সূত্র প্রয়োগ করতে পারবেন। ধারার সমান্তর ও গুণোত্তর ধারার সূত্র আলাদা করে লিখে রাখুন, আর প্রতিটি সূত্রের অন্তত তিনটি করে অঙ্ক কষুন। বীজগণিতে ভুলের সবচেয়ে বড় কারণ হলো চিহ্নের ভুল, তাই প্রতিটি লাইন লেখার পর চিহ্ন মিলিয়ে দেখুন।
জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি: উপপাদ্য বাদ দেবেন না
জ্যামিতির অধ্যায়গুলো: ব্যবহারিক জ্যামিতি, বৃত্ত, ত্রিকোণমিতি। বৃত্তের উপপাদ্য অনেক শিক্ষার্থী বাদ দেয়, কিন্তু এখান থেকে নিয়মিত সৃজনশীল প্রশ্ন আসে। উপপাদ্য মুখস্থ না করে চিত্র এঁকে প্রমাণ বুঝুন, কারণ চিত্র ছাড়া উপপাদ্যের নম্বর পুরো পাওয়া যায় না। ত্রিকোণমিতিতে কোণের মানের টেবিল, দূরত্ব ও উচ্চতার অঙ্ক, আর পরিচিত কোণের অনুপাত ভালো করে আয়ত্ত করুন। ব্যবহারিক জ্যামিতিতে কম্পাস ও স্কেলের সঠিক ব্যবহার অভ্যাস করুন, কারণ অপরিচ্ছন্ন চিত্রে নম্বর কাটা যায়।
পরিমিতি ও পরিসংখ্যান: সহজ নম্বরের জায়গা
পরিমিতিতে ক্ষেত্রফল ও আয়তনের সূত্র, ঘনবস্তুর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল, আর একক রূপান্তর ভালো করে শিখুন। পরিসংখ্যানে গড়, মধ্যক, প্রচুরক, সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে গড়, ওজাইভ, বহুভুজ, এই বিষয়গুলো থেকে সৃজনশীল প্রশ্ন আসে। পরিসংখ্যানের অঙ্কে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় শ্রেণি ব্যবধান ও মধ্যবিন্দু নির্ণয়ে, তাই ছক আঁকার সময় সাবধান থাকুন। এই দুই অধ্যায় তুলনামূলক সহজ, তাই এখান থেকে পুরো নম্বর তোলার লক্ষ্য রাখুন।

বহুনির্বাচনি প্রস্তুতির কৌশল
| কৌশল | কীভাবে করবেন |
|---|---|
| ভুল অপশন বাদ দেওয়া | প্রথমে স্পষ্ট ভুল দুটি অপশন কেটে দিন, বাকি দুটির মধ্যে হিসাব করে বেছে নিন |
| আটকে গেলে এগিয়ে যাওয়া | একটি প্রশ্নে বেশি সময় নষ্ট করবেন না, পরে ফিরে আসুন |
| অনুমান নয়, হিসাব | সূত্র মনে না থাকলে ছোট মান বসিয়ে যাচাই করুন |
বহুনির্বাচনি অংশের সময় বণ্টন নিয়ে বোর্ড বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি, তাই নির্দিষ্ট মিনিটের দাবি করা যাবে না। সাধারণ নিয়ম: প্রতি প্রশ্নে গড়ে এক মিনিটের বেশি সময় নেবেন না, আর শেষে সব উত্তর মিলিয়ে দেখার সময় রাখুন।
সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কৌশল
সৃজনশীল প্রশ্ন বাছাই করার সময় প্রথমে পুরো প্রশ্নপত্র পড়ুন। যে প্রশ্নের ক ও খ অংশ নিশ্চিত পারেন, সেগুলো আগে বেছে নিন। উত্তর লেখার সময় ধাপ দেখিয়ে লিখুন, কারণ ধাপে ধাপে নম্বর দেওয়ার সাধারণ রীতি আছে, যদিও এটি বোর্ডের ঘোষিত নিয়ম হিসেবে পড়া যায়নি। চূড়ান্ত উত্তর ভুল হলেও সঠিক ধাপের নম্বর পাওয়া যেতে পারে, তাই মাঝপথে অঙ্ক ছেড়ে দেবেন না। চিত্র, ছক, সূত্র, প্রতিটি অংশ পরিষ্কার করে লিখুন।
টেস্ট পেপার ও বিগত বছরের প্রশ্ন
প্যাঞ্জেরি টেস্ট পেপারস মেড ইজিতে থাকে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের বোর্ড প্রশ্ন, শীর্ষ স্কুলের টেস্ট প্রশ্ন, তারকা চিহ্নিত বারবার আসা প্রশ্ন, সময় ধরে মডেল টেস্ট, অধ্যায়ভিত্তিক মডেল টেস্ট। বিগত ৫ বছরের বোর্ড প্রশ্ন সমাধান করলে প্রশ্নের ধরন বোঝা যায়। তবে শুধু টেস্ট পেপার মুখস্থ করলে হবে না, কারণ প্রশ্নের সংখ্যা বদলে যায়, ধরন থাকে। টেস্ট পেপার ব্যবহার করুন অনুশীলনের জন্য, সাজেশন হিসেবে নয়। প্রথম আলোর মডেল টেস্ট ও সত্ত একাডেমির পেজ এই রিসার্চে সরাসরি পড়া হয়নি, তাই সেগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে নির্দিষ্ট দাবি করা যাবে না।
ভুল খাতা ও সংশোধনের অভ্যাস
একটি ভুল খাতা রাখুন। যে অঙ্কে ভুল হলো, সেটি ভুল খাতায় লিখুন, ভুলের কারণ লিখুন, আর সঠিক সমাধান পাশে লিখুন। সপ্তাহে একদিন ভুল খাতার অঙ্কগুলো আবার কষুন। গণিতে দুর্বল হলে প্রথমে সহজ অধ্যায় দিয়ে শুরু করুন, যেমন পরিসংখ্যান ও পরিমিতি, তারপর বীজগণিত, সবশেষে জ্যামিতির উপপাদ্য। প্রতিদিন ১ থেকে ২ ঘণ্টা গণিত অভ্যাস করুন, একদিনে ৫ ঘণ্টা পড়ে তিনদিন না পড়ার চেয়ে প্রতিদিন অল্প করে পড়া ভালো।
সপ্তাহভিত্তিক প্রস্তুতির ছক
| পর্যায় | কাজ |
|---|---|
| প্রথম পর্যায় | সব অধ্যায়ের সূত্র ও মূল ধারণা শেষ করা, প্রতিটি সূত্রের তিনটি করে অঙ্ক |
| দ্বিতীয় পর্যায় | বিগত ৫ বছরের বোর্ড প্রশ্ন সমাধান, ভুল খাতা তৈরি |
| তৃতীয় পর্যায় | সময় ধরে মডেল টেস্ট, ভুল খাতার অঙ্ক পুনরায় করা, দুর্বল অধ্যায়ে ফিরে যাওয়া |
সূত্র মনে রাখার কৌশল
সূত্র মুখস্থ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সূত্রের খাতা বানানো। প্রতিটি অধ্যায়ের সূত্র এক পৃষ্ঠায় লিখুন, পাশে একটি করে উদাহরণ অঙ্ক লিখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সূত্রের খাতা একবার পড়ুন, রাতে ঘুমানোর আগে আবার একবার পড়ুন। সূত্র শুধু পড়লে মনে থাকে না, সূত্র দিয়ে অঙ্ক কষলে মনে থাকে। তাই প্রতিটি সূত্র শেখার পর সঙ্গে সঙ্গে দুটি অঙ্ক কষুন। ভুলে যাওয়া সূত্র ভুল খাতায় লিখে রাখুন, আর সপ্তাহে একদিন ভুলে যাওয়া সূত্রগুলো আবার দেখুন।
পরীক্ষার হলে গণিতের উত্তর দেওয়ার ক্রম
পরীক্ষার হলে প্রথমে বহুনির্বাচনি অংশ শেষ করুন, কারণ এতে ৩০ নম্বর, আর এখানে আটকে গেলে লিখিত অংশের সময় কমে যাবে। তারপর সৃজনশীল অংশে যে প্রশ্নগুলো সবচেয়ে ভালো পারেন, সেগুলো আগে লিখুন। কঠিন প্রশ্ন শেষে রাখুন। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্নের ক অংশ প্রথমে লিখুন, কারণ ক অংশের ২ নম্বর তুলনামূলক সহজ। শেষ ১০ মিনিটে সব উত্তর মিলিয়ে দেখুন: চিহ্ন ঠিক আছে কি না, একক লেখা হয়েছে কি না, চিত্রে নাম দেওয়া হয়েছে কি না। উত্তরপত্রে কোনো অংশ ফাঁকা রাখবেন না, আংশিক চেষ্টাও লিখে যান।
ক্যালকুলেটর ব্যবহারের নিয়ম
মূল নীতি: শুধু সাধারণ, প্রোগ্রাম করা যায় না এমন বৈজ্ঞানিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যাবে। প্রোগ্রামযোগ্য ক্যালকুলেটর নিষিদ্ধ। কোন বছরে কোন মডেল অনুমোদিত, তা বছরভেদে বদলায়, আর কিছু কেন্দ্রে ক্যালকুলেটর জব্দের খবরও আছে। তাই কোনো বছরের মডেল তালিকা চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে লেখা যাবে না। পরীক্ষার আগে নিজের কেন্দ্রের ঘোষণা মিলিয়ে নিন, আর ক্যালকুলেটরের ব্যাটারি পরীক্ষা করে নিন।
যেসব ভুলে নম্বর কাটা যায়
প্রথম ভুল: জ্যামিতির উপপাদ্য বাদ দেওয়া। দ্বিতীয় ভুল: চিত্র না আঁকা বা অপরিচ্ছন্ন চিত্র আঁকা। তৃতীয় ভুল: সূত্র মুখস্থ করে প্রয়োগ না বোঝা। চতুর্থ ভুল: বহুনির্বাচনি অনুশীলন শেষ সপ্তাহে ফেলে রাখা। পঞ্চম ভুল: চিহ্নের ভুল, বিশেষ করে বীজগণিতে। ষষ্ঠ ভুল: অঙ্কের ধাপ না দেখিয়ে শুধু উত্তর লেখা। সপ্তম ভুল: একদিনে অনেক পড়ে কয়েকদিন না পড়া।
সচরাচর প্রশ্ন
গণিতে দুর্বল হলে কীভাবে শুরু করব?
সহজ অধ্যায় দিয়ে শুরু করুন, যেমন পরিসংখ্যান ও পরিমিতি, তারপর বীজগণিত, সবশেষে জ্যামিতির উপপাদ্য। প্রতিদিন ১ থেকে ২ ঘণ্টা অভ্যাস করুন।
কোন অধ্যায় থেকে বেশি নম্বর আসে?
কোনো অধ্যায়ের নিশ্চিত নম্বর সংখ্যা কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি, তাই নির্দিষ্ট অঙ্কের দাবি করা যাবে না। সাধারণ প্রবণতা: বীজগণিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি, পরিসংখ্যান, সব অধ্যায় থেকেই প্রশ্ন আসে।
টেস্ট পেপার কতটা কাজে লাগে?
টেস্ট পেপার অনুশীলনের জন্য কাজে লাগে, সাজেশন হিসেবে নয়। বিগত ৫ বছরের বোর্ড প্রশ্ন সমাধান করলে প্রশ্নের ধরন বোঝা যায়।
ক্যালকুলেটর ব্যবহারের নিয়ম কী?
শুধু সাধারণ, প্রোগ্রাম করা যায় না এমন বৈজ্ঞানিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যাবে। মডেল তালিকা বছরভেদে বদলায়, কেন্দ্রের ঘোষণা মিলিয়ে নিন।
সৃজনশীলে আংশিক নম্বর পাওয়া যায় কি?
ধাপে ধাপে নম্বর দেওয়ার সাধারণ রীতি আছে, তবে এটি বোর্ডের ঘোষিত নিয়ম হিসেবে পড়া যায়নি। তাই চূড়ান্ত উত্তর ভুল হলেও সঠিক ধাপ লিখে যান, মাঝপথে অঙ্ক ছেড়ে দেবেন না।
সিলেবাস ও নম্বর বিভাজন এখানে: এসএসসি সিলেবাস ও নম্বর বিভাজন ২০২৭। পরীক্ষার হলে করণীয় এখানে: পরীক্ষার হলে করণীয় ও ওএমআর শিট ভরাটের নিয়ম।
এই লেখার তথ্য ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে যাচাই করা হয়েছে। বোর্ড নতুন বিজ্ঞপ্তি দিলে এই পাতার তথ্য আপডেট করা হবে। (বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী; চূড়ান্ত তথ্য নিজের স্কুল ও বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি থেকে মিলিয়ে নিন।)
