Skip to main content

Jante Hobe

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

সর্বশেষ লেখা

পরীক্ষার হলে বইয়ের পাতা চোখের সামনে ভাসে, অথচ উত্তর মনে আসে না। এই অভিজ্ঞতা প্রায় সব শিক্ষার্থীরই আছে। পড়া মনে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিজেকে বারবার পরীক্ষা করা এবং সময়ের ব্যবধান রেখে একই পড়া আবার ঝালিয়ে নেওয়া।

২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণা পর্যালোচনায় দশটি জনপ্রিয় পড়ার কৌশল যাচাই করা হয়। সেখানে নিজেকে পরীক্ষা করা এবং ব্যবধান রেখে পড়া, এই দুটি পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে চিহ্নিত হয়। বিপরীতে, শুধু বারবার পড়ে যাওয়া কিংবা হাইলাইটার দিয়ে দাগ দেওয়া তুলনামূলকভাবে কম ফল দেয়।

শুধু পড়ে গেলে কেন মনে থাকে না

একই অধ্যায় তিনবার পড়লে তৃতীয়বারে লেখাগুলো চেনা চেনা লাগে। এই চেনা ভাবটাকেই আমরা জানা বলে ভুল করি। কিন্তু চেনা লাগা আর মনে করে বলতে পারা এক জিনিস নয়।

পরীক্ষায় আপনাকে লিখতে হয় না দেখে, বরং মনে করে। তাই পড়ার সময় মস্তিষ্ককে সেই মনে করার কাজটাই করাতে হয়। যে পড়ায় মনে করার অনুশীলন নেই, সে পড়া পরীক্ষার হলে গিয়ে কাজে আসে কম।

কৌশল ১: নিজেকে পরীক্ষা করা

এই পদ্ধতির নাম সক্রিয় স্মরণ (Active Recall), অর্থাৎ বই বন্ধ করে শেখা বিষয়টি নিজে নিজে মনে করে বলা বা লেখা। পড়া শেষ করে বই খুলে রাখা অবস্থায় নিজেকে যাচাই করা যায় না। বই বন্ধ করতেই আসল অনুশীলন শুরু হয়।

পদ্ধতিটি সহজ। একটি অংশ পড়া শেষ হলে বই বন্ধ করুন। তারপর নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই অংশে মূল কথা কী ছিল, কেন এমন হলো, উদাহরণটা কী ছিল। যা মনে আসে, মুখে বলুন কিংবা খাতায় লিখে ফেলুন।

এরপর বই খুলে মিলিয়ে দেখুন। যেখানে ভুল হয়েছে বা যা মনে আসেনি, সেটুকু আবার পড়ুন। এই ভুল ধরার মুহূর্তটাই শেখার সবচেয়ে দামি অংশ। পরের বার একই জায়গায় আর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

ফ্ল্যাশকার্ড (Flashcard), অর্থাৎ একপাশে প্রশ্ন ও অন্যপাশে উত্তর লেখা ছোট কার্ড, এই কাজে খুব কাজে লাগে। ভালো কার্ড বানানোর নিয়ম দুটি। এক কার্ডে একটি মাত্র প্রশ্ন রাখুন, আর উত্তর লিখুন নিজের ভাষায়, বইয়ের বাক্য হুবহু নয়।

কার্ড উল্টেও অনুশীলন করা যায়। উত্তর দেখে প্রশ্নটি কী ছিল তা মনে করার চেষ্টা করুন। যেসব কার্ডে বারবার ভুল হয়, সেগুলো আলাদা গোছায় রাখুন। সহজ হয়ে যাওয়া কার্ডে সময় কমিয়ে কঠিনগুলোতে মনোযোগ দিন।

অধ্যায়ের শেষের অনুশীলনী প্রশ্নের উত্তর না দেখে লেখার চেষ্টা করাও একই কাজ করে। নমুনা প্রশ্নপত্র ঘড়ি ধরে দেওয়া তো আছেই।

কৌশল ২: ব্যবধান রেখে আবার পড়া

দ্বিতীয় পদ্ধতির নাম ব্যবধানযুক্ত পুনরাবৃত্তি (Spaced Repetition), অর্থাৎ একই পড়া একবারে শেষ না করে কয়েকদিন ধরে ভাগে ভাগে আবার পড়া। একটানা পাঁচ ঘণ্টা পড়ার চেয়ে একই সময় পাঁচ দিনে ভাগ করে পড়লে মনে থাকে বেশিদিন।

কারণটি সহজ। কয়েকদিন পর পড়াটি আংশিক ভুলে যাওয়ার পর আবার মনে করার চেষ্টা করলে স্মৃতি আরও মজবুত হয়। প্রতিবার ব্যবধান একটু একটু করে বাড়ানো যায়।

একটি নমুনা ছক হতে পারে এমন: নতুন পড়া শেখার পরদিন একবার ঝালাই করুন। তারপর তিন দিন পর আরেকবার, এক সপ্তাহ পর আরেকবার, দুই সপ্তাহ পর শেষবার। এটি কোনো কঠোর নিয়ম নয়, নিজের সময় ও পরীক্ষার তারিখ অনুযায়ী সাজিয়ে নেওয়া যায়।

ঝালাই করার মানেই আবার পুরো অধ্যায় পড়া নয়। প্রতিবার নিজেকে পরীক্ষা করাই হলো ঝালাই। যেটুকু সহজে মনে আসে, সেটুকুতে কম সময় দিন। যেটুকু ভুল হয়, সেটুকুতে সময় বাড়ান।

কৌশল ৩: বিষয় মিশিয়ে অনুশীলন করা

অনেকেই এক অধ্যায়ের সব অঙ্ক শেষ করে তারপর পরের অধ্যায়ে যান। এর বদলে একই পড়ার সেশনে দুই-তিন ধরনের সমস্যা মিশিয়ে অনুশীলন করাকে বলে মিশ্র অনুশীলন (Interleaving), অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বিষয় পালাক্রমে চর্চা করা।

গণিতে যেমন একদিনে এক ধরনের অঙ্কের পাশাপাশি আগের অধ্যায়ের অঙ্কও রাখা যায়। এতে প্রতিটি সমস্যা দেখে নিজেকেই ঠিক করতে হয় কোন নিয়ম লাগবে। পরীক্ষার হলেও ঠিক এই কাজটাই করতে হয়, সেখানে কোনো অধ্যায়ের নাম লেখা থাকে না।

শুরুতে এই পদ্ধতি একটু কঠিন মনে হতে পারে। তবে এই কঠিন লাগাটাই মস্তিষ্কের কাজের লক্ষণ। সহজ লাগা মানেই ভালো শেখা হচ্ছে, এমন নয়।

কৌশল ৪: নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা

কোনো বিষয় নিজের ভাষায় অন্যকে বোঝানোর মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারলে বোঝা গভীর হয়। পড়ার সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন, এটি কেন এমন হলো, আগের পড়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী। এই কেন-ভিত্তিক প্রশ্ন করাকে গবেষণায় আলাদা কৌশল হিসেবে দেখা হয়েছে।

বন্ধুকে পড়াতে গিয়ে যেখানে আটকে যাবেন, সেখানেই আপনার ফাঁক রয়ে গেছে। সেই জায়গাটি তখন বই থেকে আবার পড়ে নিন। কাল্পনিক শ্রোতাকে বোঝানোর মতো করে নিজে নিজে বললেও একই কাজ হয়।

কার্যকর পড়ার কৌশলগুলো এক নজরে
কৌশল কীভাবে করবেন মূল কাজ
সক্রিয় স্মরণ বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন, উত্তর বলুন বা লিখুন মনে করার শক্তি বাড়ায়
ব্যবধানযুক্ত পুনরাবৃত্তি একই পড়া কয়েকদিনের ব্যবধানে আবার ঝালাই করুন দীর্ঘদিন মনে রাখে
মিশ্র অনুশীলন এক সেশনে দুই-তিন ধরনের বিষয় পালাক্রমে চর্চা করুন সঠিক নিয়ম বাছাই শেখায়
নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা কেন ও কীভাবে প্রশ্ন করে নিজের কথায় বুঝিয়ে বলুন বোঝা গভীর করে

একটি পড়ার সেশন কীভাবে সাজাবেন

কৌশলগুলো জানা এক কথা, প্রতিদিনের পড়ায় সেগুলো বসানো আরেক কথা। পঞ্চাশ মিনিটের একটি সেশনের নমুনা হতে পারে এমন। প্রথম দশ মিনিটে আগের দিনের পড়া বই বন্ধ করে ঝালাই করুন, নিজেকে প্রশ্ন করে।

এরপর ত্রিশ মিনিট নতুন পড়া পড়ুন, তবে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে থেমে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন এ পর্যন্ত কী বুঝলেন। শেষ দশ মিনিটে পুরো অংশটি না দেখে খাতায় মূল পয়েন্টগুলো লিখে ফেলুন। তারপর বই খুলে ফাঁকগুলো মিলিয়ে নিন।

মাঝে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের ছোট বিরতি নিন। একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকলে মনোযোগ ঝরে যায়, আর মনোযোগ ছাড়া পড়া মানে শুধু চোখ বোলানো। বিরতিতে ফোন হাতে না নিয়ে একটু হেঁটে আসা বা পানি খাওয়া ভালো।

সপ্তাহে একদিন রাখুন শুধু ঝালাইয়ের জন্য। সেই দিন নতুন কিছু না পড়ে সপ্তাহের সব পড়া নিজেকে পরীক্ষা করে যাচাই করুন। কোন অধ্যায় দুর্বল রয়ে গেছে, সেটি সেই দিনই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ঘুম ও বিশ্রামের ভূমিকা

রাত জেগে পড়া অনেকের অভ্যাস, বিশেষ করে পরীক্ষার আগের রাতে। অথচ ঘুমের সময়ই দিনের শেখা বিষয়গুলো মস্তিষ্কে সাজানো আকারে জমা হয়। ঘুম কম হলে পরদিন মনোযোগও কমে, মনে করাও কঠিন হয়।

পরীক্ষার আগের রাতে নতুন কিছু গিলতে না গিয়ে হালকা ঝালাই করে তাড়াতাড়ি ঘুমানো ভালো সিদ্ধান্ত। সারা বছর অল্প অল্প করে পড়া থাকলে এমনিতেই শেষ রাতের ওপর চাপ কম পড়ে।

যেসব অভ্যাসে সময় নষ্ট হয়

প্রথম অভ্যাস, একই পৃষ্ঠা বারবার পড়ে যাওয়া। এতে সময় যায় অনেক, আত্মবিশ্বাসও বাড়ে, কিন্তু পরীক্ষার হলে মনে পড়ে কম। পড়ার বদলে নিজেকে পরীক্ষা করায় সময় দিন।

দ্বিতীয় অভ্যাস, পুরো বই হাইলাইটার দিয়ে রঙিন করে ফেলা। সবকিছু দাগ দেওয়া মানে আসলে কিছুই আলাদা করা হলো না। দাগ দিলে শুধু সেই একটি বাক্যে দিন, যা সত্যিই মূল ধারণাটি ধরে রেখেছে।

তৃতীয় অভ্যাস, শুধু সহজ ও প্রিয় বিষয় বারবার পড়া। কঠিন অংশ এড়িয়ে গেলে পরীক্ষায় সেখান থেকেই নম্বর হারাতে হয়। কঠিন বিষয় ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে আগেভাগে শুরু করুন।

চতুর্থ অভ্যাস, পড়ার টেবিলে ফোন পাশে রাখা। বারবার নজর গেলে মনোযোগ ভেঙে যায়, আর ভাঙা মনোযোগ ফিরে পেতে সময় লাগে। পড়ার সেশনের সময় ফোন অন্য ঘরে বা ব্যাগে রেখে দিন। জরুরি কাজ থাকলে সেশন শেষে দেখুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

ফ্ল্যাশকার্ড কি সব বিষয়ের জন্য কাজ করে?

সংজ্ঞা, তারিখ, সূত্র ও শব্দার্থের মতো তথ্যভিত্তিক পড়ায় এটি সবচেয়ে কাজের। গাণিতিক সমস্যা বা রচনামূলক উত্তরের জন্য অনুশীলন প্রশ্নের বিকল্প হতে পারে না। বিষয় অনুযায়ী দুটোই ব্যবহার করুন।

একদিনে কতক্ষণ পড়লে সবচেয়ে ভালো হয়?

এর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। কত ঘণ্টা পড়লেন তার চেয়ে জরুরি হলো সেই সময়ে কতবার নিজেকে পরীক্ষা করলেন। মনোযোগ ধরে রেখে ছোট ছোট সেশনে পড়াই বেশিরভাগের জন্য কার্যকর।

পরীক্ষার মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলে কোন কৌশল নেব?

সময় কম থাকলেও নিজেকে পরীক্ষা করাই সবচেয়ে দ্রুত ফল দেয়। পুরোনো প্রশ্নপত্র ও অধ্যায়ের অনুশীলনী ধরে উত্তর লেখার অনুশীলন করুন। প্রতিদিন আগের দিনের পড়া অল্প করে ঝালাই করুন।

ঝালাই করার সময় পুরো অধ্যায় আবার পড়তে হবে?

না, ঝালাই মানে পুনরায় পড়া নয়। প্রথমে না দেখে মনে করার চেষ্টা করুন, তারপর শুধু যেটুকু ভুল হলো বা মনে এল না, সেটুকুই বই থেকে দেখে নিন। এতে সময়ও বাঁচে, স্মৃতিও মজবুত হয়।