Skip to main content

Jante Hobe

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

জ্ঞান আহরণ – সঠিক সিদ্ধান্ত – সুন্দর জীবন

সর্বশেষ লেখা

মাত্র তেইশ বছরের সক্রিয় সাহিত্যজীবনে তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা করেছেন, সঙ্গে অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। সেই অসাধারণ সৃষ্টিপ্রবাহ হঠাৎ থেমে যায় ১৯৪২ সালে, যখন দুরারোগ্য স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বাকি চৌত্রিশ বছর তাঁকে কাটাতে হয় নীরবতায়। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, বিদ্রোহী কবি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। দারিদ্র্য, কারাবাস আর অসুস্থতার বিরুদ্ধে তাঁর আজীবন সংগ্রামই তাঁর জীবনকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

জন্ম ও শৈশব: দুখু মিয়ার কঠিন দিনগুলো

কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ। জন্মস্থান বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রাম, যা বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলায় অবস্থিত। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম, মাতা জাহেদা খাতুন। পরিবারের ষষ্ঠ সন্তান নজরুলের ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া, আর সেই নামের সঙ্গে তাঁর শৈশবের দুঃখ-কষ্ট অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

শৈশবে তিনি গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজও করতেন। ১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যু হয়, তখন তাঁর বয়স মাত্র নয় বছর। সংসারের অভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁকে জীবিকার খোঁজে নামতে হয়। তিনি নিজের মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন, পাশাপাশি মাজারের সেবক ও মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন। এই পরিবেশে বড় হতে হতে তিনি ইসলামি আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন, যার গভীর ছাপ পরে তাঁর সাহিত্যে পড়েছে।

তবে মসজিদ-মক্তবের গণ্ডিতে তিনি বেশিদিন আটকে থাকেননি। বালক বয়সেই তিনি গ্রামের লেটো দলে যোগ দেন। লেটো হলো পল্লী অঞ্চলের ভ্রাম্যমাণ লোকনাট্যের দল, যেখানে গান, অভিনয় আর কবিগানের আসর বসত। তাঁর চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন লেটো দলের খ্যাতিমান ওস্তাদ। দলের জন্য নজরুল গান ও পালা রচনা শুরু করেন। শকুনিবধ, দাতা কর্ণ, কবি কালিদাসের মতো পালা সেই বয়সেই তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে।

পরে তিনি আবার পড়াশোনায় ফিরে আসেন। রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ উচ্চ বিদ্যালয় ও মাথরুন স্কুলে তিনি পড়েছেন। মাথরুন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সেকালের খ্যাতনামা কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক, যাঁর সান্নিধ্য বালক নজরুলকে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু অভাব বারবার পড়াশোনা থামিয়ে দিয়েছে। একসময় তাঁকে বাসুদেবের কবিদলে এবং আসানসোলের একটি রুটির দোকানেও কাজ করতে হয়। রুটির দোকানে কাজের সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ তাঁর লেখা কবিতা দেখে প্রতিভা চিনতে পারেন। তাঁরই সহায়তায় ১৯১৪ সালে নজরুল ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরের বছর তিনি আবার সিয়ারসোল স্কুলে ফিরে যান এবং ১৯১৭ সাল পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেন।

সৈনিক জীবন: করাচির সেনানিবাসে সাহিত্যের হাতেখড়ি

১৯১৭ সালের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা না দিয়েই নজরুল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সৈনিক ছিলেন। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম ও সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় প্রশিক্ষণের পর তাঁর কর্মস্থল হয় করাচি সেনানিবাস। সাধারণ সৈনিক থেকে তিনি কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। সেনানিবাসে এক পাঞ্জাবি মৌলভির কাছ থেকে তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন, সহ-সৈনিকদের সঙ্গে গানবাজনার চর্চাও চলতে থাকে।

করাচিতে বসেই নজরুলের সাহিত্যজীবনের প্রকৃত সূচনা হয়। এখানেই তিনি লেখেন তাঁর প্রথম গদ্য রচনা বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী, যা ১৯১৯ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা মুক্তিও এই সময়ের রচনা। ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে রেজিমেন্টটি ভেঙে দেওয়া হলে তিনি সৈনিক জীবন ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র একুশ বছর, কিন্তু অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ইতিমধ্যে অসাধারণ সমৃদ্ধ।

কলকাতায় তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কার্যালয়ে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গী হন মুজফ্‌ফর আহমদ, যাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। ১৯২০ সাল থেকে সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে তাঁর লেখকজীবনের মূল পর্ব শুরু হয়। ১৯২১ সালের অক্টোবরে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুজনের মধ্যে আমৃত্যু স্নেহের সম্পর্ক বজায় ছিল।

বিদ্রোহী কবিতা ও ধূমকেতু: খ্যাতির বিস্ফোরণ

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে নজরুল রচনা করেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী। ১৯২২ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হতেই সারা দেশের সাহিত্যসমাজে সাড়া পড়ে যায়। অত্যাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে এমন উচ্চকণ্ঠ বাংলা কবিতায় আগে শোনা যায়নি। এই একটি কবিতাই তরুণ নজরুলকে চিরদিনের জন্য বিদ্রোহী কবি পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে। একই বছরে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা, যাতে বিদ্রোহীর পাশাপাশি স্থান পায় প্রলয়োল্লাস, আগমনী, শাত-ইল-আরব ও কামাল পাশা কবিতা।

১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুল নিজে ধূমকেতু নামে পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদবাণী ছাপা হতো: আয় চলে আয় রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু। ধূমকেতু সে সময়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখপত্রের মতো কাজ করে। তীব্র রাজনৈতিক লেখার জন্য পত্রিকাটি দ্রুত ব্রিটিশ সরকারের রোষের মুখে পড়ে।

কারাগারের দিন ও রাজবন্দীর জবানবন্দি

১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ধূমকেতুর পূজা সংখ্যায় নজরুলের আনন্দময়ীর আগমনে কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই কবিতাকে কেন্দ্র করে সরকার ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং সেদিনই তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজদ্রোহে প্ররোচনার অভিযোগে তাঁর বিচার হয় কলকাতায়।

বিচার চলাকালে ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি আদালতে তিনি যে লিখিত বক্তব্য দেন, তা বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দি নামে অমর হয়ে আছে। নিজের লেখনীকে তিনি সত্যের প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেন এবং কোনো ভয় ছাড়াই নিজের অবস্থান ঘোষণা করেন। বিচারে তিনি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকেন। বন্দি অবস্থায় তাঁর জন্য সান্ত্বনার ঘটনা ঘটে ১৯২৩ সালের ২২ জানুয়ারি, যেদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বসন্ত গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। জেলে বসেই নজরুল লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

১৯২৪ সালে নজরুল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন প্রমীলা দেবীর সঙ্গে, যাঁর আসল নাম আশালতা সেনগুপ্ত। তাঁদের চার পুত্রসন্তান হয়: কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ বা বুলবুল, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। কিন্তু পারিবারিক জীবনেও শোক তাঁকে ছাড়েনি। জ্যেষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণ মুহাম্মদ শৈশবে মারা যান, প্রিয় পুত্র বুলবুলও বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সে প্রাণ হারান। এসব শোক কবির মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে, যার ছাপ তাঁর পরবর্তী রচনায় দেখা যায়।

সাহিত্যকর্ম: কবিতা

নজরুলের প্রধান পরিচয় কবি হিসেবে। অগ্নিবীণা (১৯২২) বাংলা কবিতায় এক নতুন যুগের সূচনা করে। এর পরপরই আসে বিষের বাঁশি (১৯২৪) ও ভাঙ্গার গান (১৯২৪), যেগুলোর বিদ্রোহী আবেগের কারণে ব্রিটিশ সরকার বই দুটি নিষিদ্ধ করে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ছায়ানট, প্রলয়শিখা, চক্রবাক, সিন্ধুহিন্দোল, সাম্যবাদী, ফণিমনসা, সর্বহারা ও জিঞ্জির। সাম্যবাদী ও সর্বহারা কবিতাগুচ্ছে তিনি সমাজের নিচুতলার মানুষের কথা বলেছেন, শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

তবে নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি নন। প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতাও তাঁর কবিতায় সমান গভীরতায় এসেছে। কামাল পাশা কবিতায় দেখা যায় তাঁর আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা, আর মানুষ কবিতায় মানুষের মর্যাদাই সব ধর্মগ্রন্থের ঊর্ধ্বে উঠে এসেছে। শিশুদের জন্য লেখা খুকী ও কাঠবিড়ালি, লিচু-চোরের মতো কবিতা আজও পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। হিন্দু ও মুসলিম, উভয় ঐতিহ্যের উপকরণ তিনি সমান স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করেছেন, যা বাংলা কবিতায় তাঁর আগে কেউ এতটা সাহসের সঙ্গে করেননি।

সাহিত্যকর্ম: গান ও নজরুলগীতি

সংগীতে নজরুলের অবদান আকারে প্রায় অবিশ্বাস্য। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি, যেগুলো একত্রে নজরুলগীতি বা নজরুল সংগীত নামে পরিচিত। তিনি বাংলা গানে গজলের সফল প্রবর্তন করেন, পাশাপাশি রাগপ্রধান গান, খেয়াল ও লোকসুরেও প্রচুর কাজ করেছেন। হারিয়ে যাওয়া রাগ-রাগিণী নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক আগ্রহ ছিল গভীর। ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতা বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন এবং হারামণিসহ কয়েকটি অনুষ্ঠানের জন্য নিয়মিত গান রচনা করেন।

ধর্মীয় সংগীতেও তাঁর অবদান অনন্য। মুসলিম ঐতিহ্য থেকে তিনি হামদ ও নাত রচনা করেছেন, রমজান নিয়ে লেখা ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে গানটি আজও রোজার শেষদিনে ঘরে ঘরে বাজে। আবার হিন্দু ঐতিহ্য থেকে তিনি প্রচুর শ্যামাসংগীত লিখেছেন। তাঁর চল্‌ চল্‌ চল্‌ গানটি বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে স্বীকৃত। একই মানুষের কলমে দুই ধর্মের ভক্তিসংগীত এমন সাবলীলভাবে আসা বিশ্বসংগীতের ইতিহাসেও বিরল ঘটনা।

সাহিত্যকর্ম: গদ্য, গল্প ও উপন্যাস

গদ্য সাহিত্যেও নজরুল গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রেখেছেন। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ব্যথার দান প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। অন্যান্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে রিক্তের বেদন ও শিউলিমালা। উপন্যাস লিখেছেন তিনটি: বাঁধন হারা, মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা। বাঁধন হারা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় থেকেই পাঠকমহলে সমাদৃত হয়। প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী ও রাজবন্দীর জবানবন্দিতে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবনা সরাসরি প্রকাশ পেয়েছে। যুগবাণীর তীক্ষ্ণ ভাষার কারণেই সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করেছিল।

সাহিত্যের বাইরে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন, ধূপছায়া নামে একটি ছবি তিনি পরিচালনাও করেন। সব মিলিয়ে মাত্র তেইশ বছরের কর্মজীবনে তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ এত বিপুল যে তা বিশ্লেষকদের আজও বিস্মিত করে।

অসুস্থতা: নীরবতার দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর

খ্যাতি ও সৃষ্টির এই উজ্জ্বল ধারা হঠাৎ থেমে যায় ১৯৪২ সালে। সে বছর তিনি গুরুতর স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন এবং বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৪২ সালের শেষদিকে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলায় সে সময় তাঁকে ইউরোপে নিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। এরপর কবি ও তাঁর পরিবার প্রায় এক দশক ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে নিভৃত জীবন কাটান।

১৯৫২ সালে তাঁকে রাঁচির একটি মানসিক হাসপাতালে চার মাস চিকিৎসা দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে লন্ডন, পরে ভিয়েনায় নেওয়া হয়। ভিয়েনার খ্যাতনামা চিকিৎসক ড. হ্যান্স হফ পরীক্ষা করে জানান, কবি পিক্স ডিজিজ নামক স্নায়ুঘটিত রোগে ভুগছেন, যাতে মস্তিষ্কের সামনের অংশ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা একমত হন যে ওই অবস্থা থেকে তাঁকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব নয়। হতাশা নিয়ে কবিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সাহিত্যকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জীবন কাটান।

ঢাকায় শেষ জীবন ও মৃত্যু

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুল সপরিবারে ঢাকায় আসেন। কাকতালীয়ভাবে সেদিন ছিল তাঁর জন্মদিন। ঢাকায় আসার পর থেকে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হন, যদিও আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই স্বীকৃতি জারি হয় অনেক পরে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, যা ১৯৭২ সাল থেকেই কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং একই বছর ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তবে স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটান ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, ৭৭ বছর বয়সে, তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কবির একটি গানে মসজিদের পাশে কবর দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছিল। সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তাঁর জানাজায় দশ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন এবং বাংলাদেশে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়।

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার

জীবদ্দশায় তিনি পেয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৬০ সালে তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত হন। মৃত্যুর পরের বছর, ১৯৭৭ সালে, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত করে।

তাঁর স্মৃতি ও কর্ম আজ দুই বাংলাতেই গভীরভাবে বেঁচে আছে। বাংলাদেশে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৫), ঢাকায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান কবি নজরুল ইনস্টিটিউট এবং রাজধানীর অন্যতম প্রধান সড়ক কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ। জন্মভূমি চুরুলিয়ার কাছের আসানসোলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় (২০১২)। প্রতি বছর বাংলাদেশে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয়।

শেষ বিচারে নজরুলের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর রচনাই। শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা এবং নারী-পুরুষের সমতার পক্ষে তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ প্রায় এক শতাব্দী ধরেই বাঙালির মনন গঠন করে চলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। দুখু মিয়া নামের সেই দরিদ্র বালক, যাঁর শৈশব কেটেছিল মসজিদের মুয়াজ্জিন আর রুটির দোকানের কর্মচারী হিসেবে, আজ বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি।

তথ্যসূত্র

  • রফিকুল ইসলাম, “ইসলাম, কাজী নজরুল”, বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ।
  • “কাজী নজরুল ইসলাম”, বাংলা উইকিপিডিয়া, bn.wikipedia.org।
  • “Kazi Nazrul Islam”, English Wikipedia, en.wikipedia.org।
  • নজরুলের গ্রন্থপঞ্জি, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, nazrulinstitute.gov.bd।