কর্নেল পদ্ধতি হলো খাতার একটি পৃষ্ঠাকে তিনটি অংশে ভাগ করে নোট নেওয়ার পদ্ধতি। ডানদিকে থাকে বড় নোট লেখার জায়গা, বাঁয়ে সরু একটি কলামে থাকে প্রশ্ন ও সূত্র, আর পৃষ্ঠার একেবারে নিচে থাকে সারসংক্ষেপ। এই সাজানো কাঠামোই নোট নেওয়াকে শুধু লেখা থেকে শেখার কাজে বদলে দেয়।
পদ্ধতিটি তৈরি করেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ওয়াল্টার পক (Walter Pauk), ১৯৫০-এর দশকে। তাঁর লেখা How to Study in College বইটির মাধ্যমে ১৯৬২ সাল থেকে পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষা-সহায়তা কেন্দ্র আজও শিক্ষার্থীদের এই পদ্ধতিতেই নোট নিতে শেখায়।
কেন সাধারণ নোটে পড়া মনে থাকে না
বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে বা বই পড়ার সময় যা শোনেন বা পড়েন, তা পরপর লিখে যান। সেই নোট পরে পড়তে গেলে শুধু চোখ বোলানো হয়, নিজেকে যাচাই করা হয় না। ফলে নোট খাতা ভরে থাকে, কিন্তু পরীক্ষার সময় মনে পড়ে অল্পই।
কর্নেল পদ্ধতির কাঠামো এই সমস্যাটাই দূর করে। বাঁয়ের কলামটি আপনাকে বাধ্য করে প্রতিটি অংশের জন্য প্রশ্ন তৈরি করতে। আর সেই প্রশ্নগুলো দিয়েই পরে নিজেকে পরীক্ষা করা যায়, নোটের অংশটি ঢেকে রেখে। অর্থাৎ নোট নেওয়ার সময়ই পরীক্ষার প্রস্তুতির উপকরণ তৈরি হয়ে যায়।
ধাপ ১: পৃষ্ঠাটি ভাগ করে নিন
নোট লেখা শুরুর আগেই প্রতিটি পৃষ্ঠা একইভাবে সাজিয়ে নিন। খাতার পৃষ্ঠার বাঁ দিক থেকে প্রায় আড়াই ইঞ্চি (প্রায় ৬ সেন্টিমিটার) জায়গা ছেড়ে একটি খাড়া দাগ টানুন। এই সরু অংশটিই সূত্রের কলাম (Cue Column), অর্থাৎ পরে প্রশ্ন ও মূল শব্দ লেখার জন্য রাখা সরু জায়গা।
পৃষ্ঠার নিচের দিকে প্রায় দুই ইঞ্চি (প্রায় ৫ সেন্টিমিটার) জায়গা জুড়ে একটি আড়াআড়ি দাগ টানুন। নিচের এই অংশটি সারসংক্ষেপের জন্য। মাঝখানের বড় অংশটি হলো মূল নোটের জায়গা (Note-taking Area), অর্থাৎ ক্লাস বা পড়ার সময়ের আসল নোট লেখার বড় জায়গা।
পৃষ্ঠার একেবারে ওপরে বিষয়, অধ্যায়ের নাম ও তারিখ লিখে রাখুন। পরে খুঁজতে গেলে এই ছোট তথ্যটুকু অনেক সময় বাঁচায়। প্রতিটি নতুন বিষয়ের জন্য নতুন পৃষ্ঠা নিন, দুটি বিষয় এক পৃষ্ঠায় মেশাবেন না।
| অংশ | অবস্থান ও আকার | কী লিখবেন | কখন লিখবেন |
|---|---|---|---|
| মূল নোটের জায়গা | ডানদিকের বড় অংশ | মূল ধারণা, ব্যাখ্যা, উদাহরণ ও সূত্র | ক্লাসে বা পড়ার সময় |
| সূত্রের কলাম | বাঁয়ের সরু অংশ, প্রায় আড়াই ইঞ্চি | প্রশ্ন, মূল শব্দ ও ইঙ্গিত | পড়া শেষের পরপরই |
| সারসংক্ষেপ | নিচের অংশ, প্রায় দুই ইঞ্চি | পুরো পৃষ্ঠার সার নিজের ভাষায়, কয়েক বাক্যে | পৃষ্ঠাটি শেষ করার পর |
ধাপ ২: মূল অংশে নোট লিখুন
ক্লাস চলার সময় বা বই পড়ার সময় মূল নোট শুধু বড় অংশটিতেই লিখুন, বাঁয়ের কলামটি তখন ফাঁকা রাখুন। প্রতিটি বাক্য হুবহু তুলে লিখতে যাবেন না। মূল ধারণাগুলো ছোট ছোট বাক্যে, নিজের ভাষায় লিখুন।
একটি ধারণা শেষ হলে এক লাইন ফাঁকা রাখুন। এই ফাঁকা জায়গায় পরে দরকার হলে নতুন তথ্য যোগ করা যায়। সংক্ষিপ্ত রূপ, চিহ্ন ও ছোট ছোট পয়েন্ট ব্যবহার করলে লেখার গতি ধরে রাখা যায়।
শিক্ষক যে উদাহরণটি দিলেন বা বইয়ে যে কারণটি জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তা আলাদা করে টুকে রাখুন। পরীক্ষায় সাধারণত এই জায়গাগুলো থেকেই প্রশ্ন আসে। কোনো অংশ না বুঝলে পাশে প্রশ্নচিহ্ন দিয়ে রাখুন, পরে সেটি পরিষ্কার করে নেওয়া যাবে।
ধাপ ৩: সূত্রের কলামে প্রশ্ন তৈরি করুন
পড়া শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব, সম্ভব হলে সেদিনই, বাঁয়ের কলামটি পূরণ করুন। নোটের প্রতিটি অংশের পাশে সেই অংশ নিয়ে একটি প্রশ্ন বা কয়েকটি মূল শব্দ লিখুন। প্রশ্ন আকারে লিখলে পরে নিজেকে পরীক্ষা করা সবচেয়ে সহজ হয়।
যেমন, নোটে যদি কোনো ঘটনার কারণ লেখা থাকে, পাশে লিখুন “এই ঘটনাটি কেন ঘটেছিল?” শব্দ বা সংজ্ঞার ক্ষেত্রে মূল শব্দটিই সূত্র হিসেবে যথেষ্ট। এই ধাপটিকে ছোট করে দেখবেন না, এই প্রশ্ন বানানোর কাজটাই প্রথমবার পড়াটিকে মাথায় গেঁথে দেয়।
ভালো প্রশ্ন শুধু “কী” দিয়ে শুরু হয় না। “কেন এমন হলো” বা “এটি আগের ধারণার সঙ্গে কীভাবে মিলে” জাতীয় প্রশ্ন উত্তরে চিন্তা করতে বাধ্য করে। শুধু তারিখ বা নাম মনে করার প্রশ্নের পাশাপাশি এমন ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন রাখলে বোঝাটা গভীর হয়। প্রতিটি অংশের জন্য একটি করে প্রশ্নই শুরুতে যথেষ্ট।
প্রশ্ন লিখতে গিয়ে যদি দেখেন কোনো অংশ নিয়ে প্রশ্নই বানানো যাচ্ছে না, বুঝবেন সেই অংশটি আপনি নিজেই ঠিকমতো বোঝেননি। সেই জায়গাটি তখনই বই বা শিক্ষকের কাছ থেকে পরিষ্কার করে নেওয়ার তালিকায় রাখুন। এই সংকেতটি পদ্ধতিটির একটি বড় উপকার।
ধাপ ৪: নিচে সারসংক্ষেপ লিখুন
পৃষ্ঠার একেকটি অংশ শেষ হলে নিচের জায়গাটিতে পুরো পৃষ্ঠার সার নিজের ভাষায় কয়েক বাক্যে লিখুন। বইয়ের বাক্য তুলে দেওয়া যাবে না। নিজে বুঝে, নিজের কথায় লিখতে হবে।
সারসংক্ষেপ লিখতে গিয়ে যেখানে আটকে যাবেন, বুঝতে হবে সেই অংশটি আপনার এখনো পরিষ্কার নয়। তখন মূল নোটে ফিরে গিয়ে অংশটি আবার দেখুন। এই লেখাটি পরে দ্রুত ঝালাইয়ের সময় সবচেয়ে কাজে লাগে, পুরো পৃষ্ঠা না পড়ে শুধু সারসংক্ষেপ পড়লেই মূল বিষয়টি মনে পড়ে যায়।
ধাপ ৫: পাঁচটি ধাপে নোটটি ব্যবহার করুন
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ্ধতিতে নোট ব্যবহারের পাঁচটি ধাপের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো ইংরেজিতে পাঁচটি R দিয়ে মনে রাখা হয়। প্রথম ধাপ লিপিবদ্ধ করা (Record), অর্থাৎ ক্লাসে মূল ধারণাগুলো নোটের বড় অংশে টুকে নেওয়া, যা ধাপ ২-এ করা হলো।
দ্বিতীয় ধাপ সংক্ষেপণ (Reduce), অর্থাৎ নোট কমিয়ে সূত্রের কলামে প্রশ্ন ও মূল শব্দে রূপ দেওয়া। তৃতীয় ধাপ আবৃত্তি (Recite), অর্থাৎ নোটের অংশটি ঢেকে রেখে শুধু সূত্র দেখে উত্তর নিজের ভাষায় বলা। এই ধাপটিই নিজেকে পরীক্ষা করার মূল কাজ।
চতুর্থ ধাপ চিন্তন (Reflect), অর্থাৎ শেখা বিষয়টি আগের জ্ঞানের সঙ্গে কীভাবে মেলে, কোথায় কাজে লাগে, তা ভেবে দেখা। পঞ্চম ধাপ পর্যালোচনা (Review), অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে অল্প সময় নিয়ে আগের নোটগুলো আবার ঝালাই করা। পাঁচটি ধাপ মিলেই একটি নোট সত্যিকার অর্থে শেখা হয়ে ওঠে।
একটি ছোট নমুনা
জীববিজ্ঞানের একটি অধ্যায়ের পৃষ্ঠা কেমন হতে পারে, তার ধারণা নিন। মূল অংশে লেখা থাকবে সালোকসংশ্লেষণের ধাপ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সমীকরণ। পাশের সূত্র কলামে থাকবে প্রশ্ন: “সালোকসংশ্লেষণে আলো কেন অপরিহার্য?” আর “কাঁচামালগুলো কী কী?”
নিচের সারসংক্ষেপে নিজের ভাষায় এক-দুই বাক্য: সবুজ উদ্ভিদ আলো, পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে এবং অক্সিজেন ছাড়ে। পরে ঝালাইয়ের সময় শুধু প্রশ্নগুলো দেখে উত্তর বললেই পুরো অধ্যায়টি যাচাই হয়ে যাবে।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ছবিটি একটু আলাদা হবে। মূল অংশে ঘটনার ধারা, কারণ ও ফলাফল পরপর সাজানো থাকবে। সূত্র কলামে থাকবে “এই আন্দোলন শুরু হওয়ার পেছনের কারণ কী?” ধরনের প্রশ্ন আর বিশেষ তারিখগুলো। সারসংক্ষেপে পুরো ঘটনাটির মূল মোড়টি এক-দুই বাক্যে দাঁড়াবে।
যেসব ভুলে পদ্ধতিটির লাভ কমে যায়
সবচেয়ে বড় ভুল, সূত্রের কলামটি ফাঁকা রেখে দেওয়া। শুধু পৃষ্ঠা ভাগ করে নোট লিখলেই কর্নেল পদ্ধতি হয় না, আসল কাজটি হয় প্রশ্ন তৈরি আর নিজেকে পরীক্ষা করার মধ্য দিয়ে। কলাম ফাঁকা থাকলে নোটটি সাধারণ নোটের মতোই থেকে যায়।
দ্বিতীয় ভুল, সারসংক্ষেপ না লেখা। তৃতীয় ভুল, বইয়ের বাক্য হুবহু তুলে লেখা, এতে বোঝার কাজটি হয় না। চতুর্থ ভুল, নোট লিখে মাসের পর মাস ফেলে রাখা। পর্যালোচনার ধাপটি না মানলে সময়ের সঙ্গে সবই ঝাপসা হয়ে আসে, যে কোনো পদ্ধতিতেই।
কোন বিষয়ে এই পদ্ধতি সবচেয়ে কাজের
ইতিহাস, সাহিত্য, জীববিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানের মতো ধারণাভিত্তিক বিষয়ে এই পদ্ধতি বিশেষভাবে কাজ করে। গণিতের ক্ষেত্রে সূত্র ও নিয়মের নোটে এটি ব্যবহার করা যায়, তবে লম্বা অঙ্কের অনুশীলনের জন্য আলাদা খাতা রাখাই ভালো। সেখানে প্রতিটি ধরনের অঙ্কের পাশে কোন নিয়মটি কেন খাটল, সেই সূত্রটি লিখে রাখলেও একই ধরনের লাভ পাওয়া যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রতিটি পৃষ্ঠাই কি আলাদা করে ভাগ করতে হবে?
হ্যাঁ, তবে কয়েকদিনের অভ্যাসে দাগ টানাটা কয়েক সেকেন্ডের কাজ হয়ে যায়। চাইলে অনেকগুলো পৃষ্ঠা একসঙ্গে আগেই ভাগ করে রাখতে পারেন। মূল বিষয় হলো প্রতিটি পৃষ্ঠায় তিনটি অংশের জায়গা থাকা।
ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে কি এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়?
যায়, যদি নোট নেওয়ার অ্যাপে পৃষ্ঠাটিকে একই তিন ভাগে সাজানো যায়। কাগজ বা পর্দা মাধ্যম মাত্র, আসল বিষয় হলো প্রশ্ন তৈরি করা এবং নিজেকে পরীক্ষা করার ধাপগুলো ঠিকঠাক মানা।
সূত্রের কলাম কখন পূরণ করা সবচেয়ে ভালো?
পড়া শেষের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, সেদিনের মধ্যেই। দেরি হলে নোটের অনেক অংশ নিজের কাছেই অপরিচিত লাগতে শুরু করে, তখন ভালো প্রশ্ন তৈরি করা কঠিন হয়ে যায়। ক্লাসের পর দশ মিনিট সময় রাখলেই এই কাজটি হয়ে যায়।
একটি পৃষ্ঠায় জায়গা না ধরলে কী করব?
পরের পৃষ্ঠায় চলে যান, নোট চাপাচাপি করে এক পৃষ্ঠায় আটকাতে যাবেন না। প্রতিটি পৃষ্ঠার নিজস্ব সূত্র কলাম ও সারসংক্ষেপ থাকলে ঝালাইয়ের সময় সুবিধা হয়। একটি বড় বিষয় কয়েকটি পৃষ্ঠাজুড়ে থাকা স্বাভাবিক, পৃষ্ঠাগুলোতে নম্বর দিয়ে রাখুন শুধু।