মুনাফার লোভে মনুষ্যত্ব বিসর্জন: বিপন্ন জনস্বাস্থ্য ও আমাদের দায়বদ্ধতাঃ আমাদের দেশে “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন” কেবল নীতিনির্ধারকের টেবিলে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে কিনা—এ প্রশ্ন এখন প্রায় প্রতিনিয়ত উঠছে। একটি আইনের মূল্য তখনই প্রমাণিত হয়, যখন সেটি বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। তবে আমাদের নিত্যদিনের বাজার পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এটি যেন প্রত্যাশিত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাজারের আড়ালে নৈতিক স্খলন
চট্টগ্রামের চকবাজার, শহরতলীতে অবস্থিত ব্যস্ত এক কাঁচাবাজার, যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে জনাকীর্ণতা ও লোকে পরিপূর্ণ উৎসবমুখর আয়োজনে কেনাকাটা এবং ব্যবসায়িক তৎপরতার চিত্র। কিন্তু এই জমজমাট পরিবেশের কোনো এক কোনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর উদ্বেগের বিষয়, যার সাথে জড়িয়ে আছে সামাজিক মূল্যবোধের অবনতির চিত্র। এখানে সামান্য লাভের লোভে মানবিক গুণাবলি হারিয়ে যাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য।
ডিম একটি সহজলভ্য ও দামে সাধারণের নাগালের মধ্যে উৎকৃষ্ট মানের এক পুষ্টিকর খাবার। সম্প্রতি এই এলাকায় পাইকারি ডিমের দোকানগুলোতে গিয়ে সরেজমিন চোখে পড়ে, এখানে ভালো ডিমের পাশাপাশি অনেকটা উন্মুক্তভাবে বিক্রি হচ্ছে ফাটা, অর্ধভাঙা ও পরিত্যক্ত ডিম। স্যাঁতস্যাতে পরিবেশে, দুর্গন্ধযুক্ত, এমনকি দীর্ঘকাল সংরক্ষিত অর্ধ নষ্ট, ফাটা ডিম দিনের বেলায় প্রকাশ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।
হযরত সৈয়দ সুলতান উদ্দিন বাচা বাবা (রহ.) এর ৭৩তম পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ
নিভৃত ঘাতক: পরিত্যক্ত ডিমের গন্তব্য
দামে তুলনামূলক কম হওয়ায় এসব ডিমের নিয়মিত ক্রেতা ফুটপাতের খাবারের দোকান, রেস্টুরেন্ট এবং নিম্নমানের বেকারিসমূহ। এসব পরিত্যক্ত ডিম ব্যবহার করে প্রস্তুত হচ্ছে ভর্তা, পাকোড়া, রুটি, মিষ্টান্ন, কেক, রেস্টুরেন্টে চা এবং আরও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী। এই অসদুপায় অবলম্বন শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সৃষ্টি করছে না, বরং মানুষ হিসেবে এটি ব্যবসায়ীদের চরম মনুষ্যত্বহীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ। যখন কোনো বিক্রেতা সচেতনভাবে এমন খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করেন যা মানুষের ক্ষতি সাধন করবে, তখন এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি এক গভীর নৈতিক স্খলনেরও প্রমাণ।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে ফাটা বা অর্ধভাঙা ডিমে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণ ঘটতে পারে এবং রোগসৃষ্টিকারী ক্ষতিকর অণুজীব মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়তে পারে।
-
সংক্রমণের উৎস: ডিম বহনকারী ট্রে বা রেকে অনেকসময় ডিমের সাথে মুরগির মল, বিষ্ঠা লেগে থাকে যা পরিবহনকালীন ডিমের ত্বকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে।
-
শেলফ লাইফ: আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ভালো, অক্ষত খোসাবৃত ডিমের শেলফ লাইফ তিন-পাঁচ সপ্তাহ। কিন্তু ফাটা খোসাযুক্ত ডিমের ক্ষেত্রে তা মাত্র দুই-তিন ঘন্টা। এরপর সেগুলো নষ্ট হয় বা পঁচে যায়।
-
রোগব্যাধি: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এর রিপোর্ট অনুযায়ী অর্ধভাঙা বা ফাটা ডিমে সালমোনেলা ভাইরাস ও অন্যান্য ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণে বিষক্রিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে যা মানব স্বাস্থ্যে ডায়রিয়া, পাকস্থলীর প্রদাহ, কিডনি ও লিভারের জটিলতা সৃষ্টি করে। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসব ডিমে ভিব্রিও কলেরা ও শিগেলা ভাইরাস সংক্রমণও ঘটে।
বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে রোগে আক্রান্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষেরা। যারা দৈনিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে সাশ্রয়ী খাবারের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এমন খাদ্য হয়ে উঠছে নিরব মৃত্যুফাঁদ। পেট ভরানোর খাবারের মধ্যে লুকিয়ে থাকছে অসুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের সক্রিয় অণুজীব বা জীবাণু। চিন্তা করুন, যে ব্যক্তি সারাদিন পরিশ্রম করে ১০ টাকার নাস্তায় তৃপ্তি খুঁজছিল, সেই খাবারই যদি তার শরীরে বিষ প্রবেশ করায়, তবে এই দায়ভার কার?
প্রবাসী শিশুদের সমস্যা ও তা সমাধানের উপায়
আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা
২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪৩ ও ৪৫ ধারা অনুসারে, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা ভেজাল খাদ্য বিক্রয়ের জন্য কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড, উভয় ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাস্তবে এই আইন যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাঝে মাঝে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম হয়, মুচলেকা নিয়ে কিছু জরিমানা আদায় হয়, কিছু প্রতিষ্ঠানে নোটিশ প্রদান করা হয়, মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু কিছু সময় পর সবকিছু পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।
উত্তরণের পথ
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং আইনের কঠোর বাস্তবায়ন। কেবল মাঝে মাঝে অভিযান নয়, প্রতিদিনের একটি সুসংগঠিত ও জবাবদিহিতামূলক বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা জনস্বাস্থ্যের সাথে প্রতারণা করে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এটি শুধুমাত্র কোনো মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতির সম্মিলিত নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এরূপ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা নাগরিকদের শারীরিক অসুস্থতার নিয়মিত কারণ হয়ে উঠা কোনোভাবে কাম্য নয়। নিরাপদ খাদ্যের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে নৈতিকতা, প্রশাসনিক সক্রিয়তা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ, এই তিনটি ভিত্তিকে দৃঢ় করতে হবে। অন্যথায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখেই থেকে যাবে—একটি নৈতিক অবক্ষয়ের নিষ্ঠুর শিকার হিসেবে।
✒️ উম্মে তানহিদা তৌহিদ
চট্টগ্রাম কলেজ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,অনার্স ৩য় বর্ষ
সমাজকর্মী
