আস্থা, উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় — জনগণের জন্য, জনগণের সঙ্গে, জনগণের বাংলাদেশ।এই হোক ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় প্রত্যয়: সালসাবিল করিম চৌধুরী: একটি দেশের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের উপর। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান দায়িত্বে থাকেন, তাই সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তাঁর নেতৃত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। জনগণ প্রধানমন্ত্রীকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং জাতির অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখতে চায়। জনগণের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, উন্নয়নকে টেকসই করা এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার দায়িত্ব মূলত তাঁর কাঁধেই বর্তায়। একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাধারণ জনগণ হিসেবে আমরা আসলে কী চাই?
ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন
সাধারণ জনগণের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা হলো দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন সবাই যেন একই আইনের অধীনে বিচার পায়। বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা একজন প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যখন জনগণ দেখে যে অপরাধী শাস্তি পাচ্ছে না বা প্রভাবশালীরা আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। তাই জনগণ চায় এমন একজন প্রধানমন্ত্রী, যিনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপসহীন থাকবেন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে দৃঢ় ভূমিকা রাখবেন।
দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রশাসন-
দুর্নীতি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা। জনগণ চায় এমন একটি প্রশাসন, যেখানে সরকারি কাজ করতে ঘুষ দিতে হবে না, সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য তদবির করতে হবে না এবং সাধারণ মানুষ সহজেই সেবা পাবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে জনগণের প্রত্যাশা হলো তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করবেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়,এই বিশ্বাস জনগণের মনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
প্রবাসী শিশুদের সমস্যা ও তা সমাধানের উপায়
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন-
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড-। একটি দেশ তখনই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোয়, যখন তার নাগরিকরা শিক্ষিত, দক্ষ ও নৈতিকভাবে সচেতন হয়। জনগণ চায়-প্রধানমন্ত্রী এমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন, যেখানে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই মানসম্মত শিক্ষা পাবে। শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা, প্রযুক্তি দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে জনগণ নেতৃত্বের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষাকে রাজনীতি মুক্ত রাখাও জনগণের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।
স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা ও মান উন্নয়ন-
মানুষের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যসেবা। জনগণ চায়- দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন বিনা ভোগান্তিতে চিকিৎসা পায়, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন চিকিৎসা থেকে বি ত না হয়।সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন, ডাক্তার ও নার্স সংকট দূর করা, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামা লে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী কার্যকর উদ্যোগ নেবেন এটাই জনগণের প্রত্যাশা। সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশই উন্নত হতে পারে না।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা-
চাকরি ও আয়-রোজগারের সুযোগ সৃষ্টি করা একটি সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। জনগণ চায়— প্রধানমন্ত্রী এমন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করবেন, যাতে তরুণরা বেকার না থাকে, উদ্যোক্তা তৈরি হয় এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়।শিল্পায়ন, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। জনগণ চায়- রাষ্ট্র এমন পরিবেশ তৈরি করুক, যেখানে মানুষ নিজের পরিশ্রমে সম্মানজনক জীবন গড়ে তুলতে পারে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার-
একটি সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন নারী-পুরুষ সমান সুযোগ পায়। জনগণ চায়- প্রধানমন্ত্রী নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন। নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জনগণের বড় প্রত্যাশা।এছাড়া প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করাও একজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব বলে জনগণ মনে করে।
গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার-
সাধারণ জনগণ চায়- দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে মজবুত করে।প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জনগণ আশা করে তিনি বিরোধী মতকে দমন না করে তা গ্রহণ করবেন, সমালোচনাকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখবেন এবং জনগণের কথা শোনার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকবেন।
টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ-
উন্নয়ন মানেই শুধু বড় বড় ভবন, সেতু বা সড়ক নির্মাণ নয়; বরং উন্নয়ন হতে হবে টেকসই ও মানবকল্যাণমুখী। জনগণ চায় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেবেন, নদী-খাল রক্ষা করবেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রনেতৃত্বের।
সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন-
দরিদ্র, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করা জনগণের বড় প্রত্যাশা। কেউ যেন না খেয়ে থাকে, চিকিৎসার অভাবে মারা না যায় এবং শিক্ষা থেকে বি ত না হয়,এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।প্রধানমন্ত্রীকে জনগণ এমন একজন নেতা হিসেবে দেখতে চায়, যিনি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়নের দিকে নজর দেন।
মানবিক, সৎ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব-
সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো প্রধানমন্ত্রী হবেন সৎ, মানবিক, দূরদর্শী ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। তিনি ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখবেন। জনগণের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবেন— এমন একজন নেতাই জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রধানমন্ত্রী। আমরা বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত পরশ্রীকাতর। আমরা স্বভাবজাত পছন্দ করিনা অন্যের প্রশংসা করতে কারণ সে আমার বিরোধীদল।এই ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারলে প্রত্যেকটা নেতা যে আসলে প্রশংসার দাবী রাখেন তা তারা বুঝতে চান না।সত্য কথা হল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সকল কাজ খারাপ হয় না।কিছুটা হলেও ভালো থাকে।সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজ গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথকে সুসংগঠিত করাও এক ধরনের স্বচ্ছ নেতৃত্ব।
একটি রাষ্ট্র কখনোই শূন্য থেকে শুরু করে না। প্রতিটি সরকার আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্জন ও ব্যর্থতার উপর দাঁড়িয়ে কাজ করে। তাই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অন্যতম গুণ হলো-সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজগুলো গ্রহণ করা, সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং যেখানে ঘাটতি ছিল, সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা।রাষ্ট্র পরিচালনা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাই নতুন সরকার আসলে পূর্ববর্তী সরকারের ভালো কাজগুলো গ্রহণ করে এবং দুর্বল দিকগুলো সংশোধন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।যেমন-
ইতিবাচক অর্জন স্বীকৃতি দেওয়া-
পূর্ববর্তী সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন, শিক্ষা সম্প্রসারণ বা দারিদ্র্য হ্রাস-যে ক্ষেত্রেই সফলতা এসেছে, সেগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এতে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং উন্নয়নের গতি বাড়ে।
ভুল ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা–
একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণ কাজগুলো বিশ্লেষণ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। যেমন-যেসব প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে, যেসব নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এসেছে বা যেসব ক্ষেত্রে জনগণের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে—সেগুলো চিহ্নিত করে নতুনভাবে পরিকল্পনা করা দরকার।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার-
পূর্ববর্তী সরকারের সব উদ্যোগ বাতিল করে দেওয়া বা কেবল রাজনৈতিক কারণে প্রকল্প বন্ধ করা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। বরং দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রীর কাজ।
নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা-
পূর্ববর্তী সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণের মতামত নেওয়া, নাগরিক ফোরাম, গণশুনানি ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা গেলে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের দিকনির্দেশনা আরও বাস্তবসম্মত হয়।
এবার আসুন দেখি আগের সরকারের উন্নয়ন সংক্রান্ত তথ্য কোথায় ও কীভাবে পাওয়া যাবে তা।
সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য। পূর্ববর্তী সরকারের উন্নয়ন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার জন্য বিভিন্ন উৎস রয়েছে।
যেমন –
ক) সরকারি নথি ও ওয়েবসাইট
মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় ওয়েবসাইট, বার্ষিক প্রতিবেদন, উন্নয়ন বাজেট, জাতীয় পরিকল্পনা দলিল এবং সংসদের কার্যবিবরণী থেকে প্রকল্প ও কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
খ) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ), পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন—টঘউচ, ডড়ৎষফ ইধহশ, অউই) উন্নয়ন সংক্রান্ত মূল্যবান প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
গ) সংবাদমাধ্যম ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন পোর্টাল এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে বাস্তব চিত্র জানা যায়।
ঘ) নাগরিক সমাজ ও এনজিও
বিভিন্ন এনজিও, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ উন্নয়ন কর্মসূচি ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঙ) সংসদীয় কমিটি ও অডিট রিপোর্ট
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (ঈঅএ) অডিট রিপোর্ট এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যবেক্ষণ থেকে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
এবার আসুন দেখি কীভাবে পরিকল্পনা করলে একটি দেশ সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে?
একটি দেশের সফল উন্নয়নের জন্য শুধু ভালো উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়, দরকার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের দক্ষতা ও জনগণের অংশগ্রহণ।
ক) দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ও জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ
একটি জাতির উন্নয়নের জন্য ১০, ২০ বা ৩০ বছরের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকা জরুরি। যেমন—উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা ইত্যাদি। এই ভিশন বাস্তবায়নের জন্য ধাপে ধাপে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার।
খ) শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব-
মানুষই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
গ) অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
একটি দেশের অর্থনীতি যদি কেবল একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে ঝুঁকি বেড়ে যায়। কৃষি, শিল্প, সেবা, আইটি, রপ্তানি ও উদ্যোক্তা খাত, সব ক্ষেত্রে সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও যুবকদের কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
ঘ) অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার
রাস্তা, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি। একই সঙ্গে ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তুললে সেবা প্রদান সহজ ও স্বচ্ছ হয়।
ঙ) দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
সুশাসন ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
চ) সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সমতা নিশ্চিত করা
উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের সব স্তরে পৌঁছে যায়-এটি নিশ্চিত করতে হবে। নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
ছ) পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ, নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন যেন প্রকৃতির ক্ষতি না করে, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়-এই নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
জ) জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিমূলক শাসন
জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনা সফল হয় না। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, নাগরিক মতামত গ্রহণ, গণশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষা চালু করলে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ে এবং উন্নয়ন কর্মসূচির সফলতা নিশ্চিত হয়।
ঝ) তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা
প্রতিটি প্রকল্প ও নীতির আগে ও পরে তথ্য সংগ্রহ, মূল্যায়ন ও গবেষণা জরুরি। কী কাজ সফল হয়েছে, কী হয়নি এবং কেন হয়নি—এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংশোধন করা গেলে উন্নয়নের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়।
সবশেষে বলা যায়,একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা মূলত একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, উন্নত ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। জনগণ চায়- নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। তারা চায় এমন নেতৃত্ব, যিনি ক্ষমতাকে সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখবেন, জনগণের কথা শুনবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যাবেন।
একই সঙ্গে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের গুণ হলো— আগের প্রধানমন্ত্রীর ভালো কাজগুলোকে অস্বীকার না করে সেগুলোকে গ্রহণ ও সংরক্ষণ করা, এবং যেখানে ঘাটতি ছিল সেখানে সাহসিকতার সঙ্গে সংস্কার আনা। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও দারিদ্র্য হ্রাসের মতো অর্জনগুলো ধরে রেখে সুশাসন, দুর্নীতি দমন, গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো একক সরকারের কাজ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি সরকার আগের সরকারের রেখে যাওয়া ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে। যদি নেতৃত্ব দূরদর্শী, মানবিক ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হয়, তবে দেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, নৈতিকভাবেও উন্নত হবে।
একজন প্রধানমন্ত্রী যদি জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে পারেন, অতীতের ভালো কাজকে সম্মান করেন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহসী ও প্রজ্ঞাময় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তবে সেই রাষ্ট্র কেবল উন্নত নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক-সালসাবিল করিম চৌধুরী
প্রভাষক ইংরেজি
নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ
রাউজান,চট্টগ্রাম।
