প্রবাসী শিশুদের সমস্যা ও তা সমাধানের উপায়

মো: ছাবির হোসাইন: বাসার বাহিরে গেলেই সাফওয়ান লাফিয়ে উঠে, আনন্দে। থুকবার রাস্তায় প্রচুর বিড়াল দেখা যায়। মাগরিবের সময় সৌদির মসজিদভিত্তিক মক্তবে যাওয়ার পথে প্রত্যেকটি বিড়ালের সাথে কথা বলে। মাগরিবের ঠিক পরপর আকাশের রঙ খুব সুন্দর দেখা যায়। রোববার ল্যাব থেকে ফিরে আমি ক্লান্ত থাকায় সেদিন ওর মা নিয়ে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে সাফু মাকে তাড়া দিচ্ছিল—“আম্মু, তাড়াতাড়ি রেডি হও, না হলে আমি আকাশের রঙ দেখতে পারব না।” এই ছোট্ট কথাটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রবাসী শিশুর শৈশব—যেখানে আনন্দের চাহিদা খুব বড় কিছু নয়, শুধু একটু আকাশ দেখা। পার্ক বা বিনোদনমূলক জায়গায় গেলে ওদের (সাফা-সাফু) ফেরার কোনো নামগন্ধ থাকে না। ফাঁকা মাঠ, একটু খোলা জায়গা পেলেই সাফু আর ওর বোন সাফা দৌড়াদৌড়ি আর খেলায় মেতে ওঠে। মনে হয়, এই অল্প জায়গাটুকুই তাদের মুক্তির নিশ্বাস।

জানালার ওপাশে শুধু দেয়াল
একদিন ইলিবেক-এর অনলাইন ক্লাসে শিক্ষিকা জিজ্ঞেস করছিলেন—
“জানালা দিয়ে আমরা কী কী দেখি?”
তিনি গাছ, পাখি, আকাশ, রাস্তা—এমন নানা কিছুর নাম বলছিলেন। হঠাৎ সাফু খুব করুণ কণ্ঠে বলে উঠল, “ম্যাডাম, আমার জানালা দিয়ে শুধু দেয়াল দেখা যায়।” শুনে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল।
আহ্—আমার পিএইচডির জন্য কি আমার সন্তানের শৈশবটা বিদেশের মাটিতে দেয়ালের ভেতর বন্দী হয়ে যাচ্ছে?
এটাই প্রবাসী শিশুদের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—তাদের শৈশব অনেক সময় খোলা মাঠের বদলে দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

প্রবাসী শিশুদের সমস্যাগুলো: কেন এগুলো গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি

১. ভাষাগত বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগের দুর্বলতা

প্রবাসী শিশুরা ঘরের বাইরে এমন এক পরিবেশে বড় হয়, যেখানে মাতৃভাষার ব্যবহার সীমিত। ধীরে ধীরে তারা বাংলায় কথা বললেও ভাব প্রকাশে জড়তা অনুভব করে। এই সমস্যা শুধু ভাষার নয়—ভাষার সঙ্গে যুক্ত আবেগ, স্মৃতি ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শিশুরা নিজেদের অনুভূতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না।

২. শিক্ষা ও কারিকুলামের অসামঞ্জস্য

এক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আরেক দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রবাসে পড়াশোনার সময় শিশুরা যে পাঠ্যবস্তুর সঙ্গে পরিচিত হয়, তা দেশে ফেরার পর অনেক ক্ষেত্রে কাজে আসে না।

ফলে শ্রেণি সমন্বয়, পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বা শিক্ষাগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। এই অনিশ্চয়তা শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও মানসিক চাপ তৈরি করে।

৩. পরিচয় সংকট ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি

প্রবাসী শিশুরা প্রায়ই দ্বিধার মধ্যে পড়ে—
সে কি এখানকার, না দেশের?

এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পেয়ে শিশুরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চিত থাকে। এর প্রভাব পড়ে আত্মবিশ্বাস, সামাজিক যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।

৪. আবেগগত একাকিত্ব ও সীমিত সামাজিকতা

দেশে যেমন পাড়া, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা খেলার মাঠ থাকে, প্রবাসে অনেক সময় তা থাকে না। শিশুদের দৈনন্দিন সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সীমিত হয়ে যায়।

এর ফলে তারা অনেক অনুভূতি নিজের ভেতর চেপে রাখে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

৫. অভিভাবকদের নীরব অপরাধবোধ

অভিভাবকেরা পেশাগত বা শিক্ষাগত প্রয়োজনে প্রবাসে থাকেন। কিন্তু সন্তানের শৈশব হারানোর অনুভূতি তাদের ভেতরে এক ধরনের নীরব অপরাধবোধ তৈরি করে।

শেকড়ের টান

সাফা-সাফু মাঝে মাঝে মোবাইল নিয়ে ছোটবেলায় বাংলাদেশে কাটানো মুহূর্তগুলো দেখে। আর বলে,
“কবে বাংলাদেশে যাব?”

সাফু লিখে রেখেছে পড়ার টেবিলের পাশে যে, বাংলাদেশে যাওয়ার আর কয়দিন বাকি আছে। প্রতিদিন দেখে আর এক দিন করে কমায়।

সৌদি আরবে ওরা দুই বছর ধরে আছে। এখনো যদি জিজ্ঞাসা করি,
“বাংলাদেশে ফিরে যাবা না এখানে থাকবা?”
এক কথায়—
“বাংলাদেশ।”

এই উত্তর কোনো তাৎক্ষণিক আবেগ নয়; এটি শেকড়ের গভীর টান।

সম্ভাব্য সমাধান: কীভাবে পরিস্থিতি বদলানো যায়

১. মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংযোগ

শিশুর চিন্তা ও অনুভূতির ভিত্তি গড়ে ওঠে মাতৃভাষায়। নিয়মিত বাংলা পড়া, লেখা ও বলা নিশ্চিত করা গেলে শিশুর আত্মপ্রকাশ সহজ হয়।

একই সঙ্গে দেশীয় গল্প, গান, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ শিশুর পরিচয়বোধ দৃঢ় করে।

২. দেশীয় কারিকুলামের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশি কারিকুলামের সঙ্গে সংযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলে দেশে ফেরার পথ মসৃণ হয়। পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বা শ্রেণি সমন্বয়ের ঝুঁকি কমে।

৩. পরিবার–শিক্ষক–শিশু সমন্বয়

শুধু পাঠদান নয়, শিশুর মানসিক অবস্থাও বোঝা জরুরি। নিয়মিত যোগাযোগ ও ফিডব্যাকের মাধ্যমে শিশুর ভয়, আগ্রহ ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা সম্ভব।

৪. খেলাধুলা ও সামাজিক দক্ষতা উন্নয়ন

খোলা জায়গায় খেলাধুলা, দলগত কাজ ও সৃজনশীল কার্যক্রম শিশুদের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করে। প্রবাসে এগুলো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।

৫. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ

প্রবাসী শিশুরা কোনো বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয়; তারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। শিক্ষা, মানসিক সহায়তা ও পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

উপসংহার

আমি একজন গবেষক। আমার পিএইচডি একদিন শেষ হবে। কিন্তু সাফ-সাফুর শৈশব আর ফিরে আসবে না।

প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর—
আমরা কি আমাদের প্রবাসী শিশুদের শৈশবকে দেয়ালের জানালার ভেতরেই আটকে রাখব, নাকি তাদের আকাশের রঙ দেখার সুযোগ করে দেব? এই সিদ্ধান্ত আমাদেরই।

লেখা-মো: ছাবির হোসাইন
পিএইচডি গবেষক, কেএফইউপিএম, সৌদি আরব, সহ: অধ্যাপক (ছুটি), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সূচনাকারী, গবেষক হতে চাই প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *