হযরত সৈয়দ সুলতান উদ্দিন বাচা বাবা (রহ.) এর ৭৩তম পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ

সুফি দর্শনের মূল কথা হলো আল্লাহ প্রেমময়। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মিলনের মাধ্যম হলো প্রেম। এই প্রেমই সুফিদের ধর্ম। প্রেম দিয়েই তাঁরা ছুঁয়ে দেখতে চান আল্লাহকে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু সালামকে এবং সমস্ত সৃষ্টিকূলকে। এই প্রেমের মধ্যেই রয়েছে আদব, বিনয়,দয়া। প্রেমের জন্ম অন্তরে। প্রেমের প্রকাশ তাই সবসময় বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। কিন্তু প্রেমিক সাধক অন্তর দিয়েই উপলব্ধি করেন সেই প্রেমের স্বরূপ। অন্তর দিয়েই অন্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হয় সততা,ন্যায়নিষ্ঠতা, শুদ্ধতা তথা শুভ্রতা।

এই আধ্যাত্মিক সাধক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন ( রহ.) প্রকাশ বাচা বাবা সম্পর্কে সৈয়দ মুহাম্মদ আযীযুল হক শেরে বাংলা আল্ ক্বাদেরী ( রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ দিওয়ান-ই-আযীয ’ ১৭৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,

মাজযুবে সালিক, সৃষ্টির প্রিয়ভাজন, বিশেষ ও সাধারণ মানুষের মিলনকেন্দ্র, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, কাশফ ও কারামতের ধারক, ফুযূযাতের উৎস, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াস্থ কাউখালীর অধিবাসী হযরত শাহ্ সুলতানুদ্দীন ওরফে বাচা ফক্বীর শাহ সাহেব -এর প্রশংসায়। তাঁর উপর তাঁর মহান রবের রহমত বর্ষিত হোক।

আস্থা, উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় — জনগণের জন্য, জনগণের সঙ্গে, জনগণের বাংলাদেশ।এই হোক ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় প্রত্যয়

শত শাবাশ, শত শাবাশ, শত শাবাশ, শাবাশ! কাউখালীর হযরত বাচা ফক্বীরকে শত শাবাশ। তিনি ছিলেন ওলীগণের মধ্যে একজন মজযূবে সালিক। তিনি ছিলেন কাশফ ও কারামতের ধারক ও পরিচ্ছন্ন আত্মার অধিকারী। জেনে রেখো! (রাঙ্গুনিয়ার) কাউখালীতে তাঁর নূরানী মাযার শরীফ অবস্থিত। সবসময় তাঁর বরকতময় সত্তা থেকে অগণিত মানুষ ফয়্য ও বরকত লাভ করে ধন্য হচ্ছে। হে বিশ্বপ্রতিপালক! তাঁর মাযার শরীফকে জান্নাতের বাগান করে দিন!হে মহান রব! নবীকুল সর্দারের ওসীলায় এ দো’আ কবুল করুন! তুমি যদি এর রচয়িতার নাম জানতে চাও, তবে জানো, তিনি হলেন ‘শেরে বাংলা’। নিঃসন্দেহে ওলীগণের অস্বীকারকারীদের জন্য তিনি হলেন শানিত তরবারি।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের কর্ণফুলী নদীর পাশে কাউখালী শাহী দরবার শরীফে আল্লাহর এই মহান অলির মাজার শরীফ অবস্থিত। এলাকায় তিনি বাচা ফকির হিসেবে খুব পরিচিত। ছোটবেলায় উনার নাম অনেক শুনতাম। শুনেছি উনি নাকি অনেক মজ্জুব ছিলেন। অনেকেই উনাকে বুঝতে পারতেন না। কারণ তিনি ফকিরের বেশে চলাফেরা করতেন। আসলে আল্লাহর প্রকৃত অলিরা এমনিই। তাঁরা আল্লাহর প্রেমে এতই বিভোর হয়ে থাকেন যে উনাদের কেউ কিছু বলেও কি না বলেও কি! তাতে উনারা কিছু মনে করেন না। কিন্তু মাঝে ক্ষতিটা হয়ে যায় যে বেয়াদবি করে তার। সেরকম কিছু ঘটনা শুনাবো আজ।

জানা যায়, বাচা বাবা ( রহ.) জীবিকা শুরু করেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে। কিন্তু এক পর্যায়ে সব পরিত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হোন। মজ্জুব অবস্থায় তিনি সব কিছু ছেড়ে বাড়ির সামনে কর্ণফুলী নদীতে ডুব দিয়ে অদূরে একটি টিলায় গিয়ে উঠেন। টানা ৩৬ বছর তিনি পবিত্র কাবা শরিফে ঝাড়ু দেয়ার কাজ করেন। এক সময় বাচা বাবা ( রহ.) নিজ গ্রামে ফিরে আসেন এবং নানান কারামত প্রকাশ পায়।

লেখক ও সাংবাদিক আহসানুল কবির রিটন ভাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর এই মহান অলির কিছু কারামত সম্পর্কে জানতে পারলাম। যা অলি প্রেমী পাঠকদের জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি 🙏।

প্রবাসী শিশুদের সমস্যা ও তা সমাধানের উপায়

বাচা বাবা (রহ.) মাজারের বর্তমান মোতোয়াল্লি এবং তাঁর ভাগিনা সৈয়দ মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৫৬ সালের আগের কথা। বাচা বাবা (রহ.)’র বর্তমানে যে মাজার রয়েছে সেই জায়গাটিকে খাস দাবি করে অনেকটা জোরজবরদস্তি সেখানে একটি দাওয়াখানা স্থাপন করে তৎকালীন সরকার। এরপর থেকে পাগলের বেশে হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকতেন বাচা বাবা (রহ.)। হাসপাতালে তখন মেডিকেল অফিসার ছিলেন উত্তর রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা মোছাব্বর মিয়া। বাচা বাবা (রহ.) কে প্রতিদিন বসে থাকতে দেখে হাসপাতালের লোকজন বিরক্ত হয়ে বলতো,
“ এখানে তোর কিছু নেই তুই চলে যায়। ”

বাচা বাবা (রহ.) বলতেন, তোরা বললেই হলো? এটা আমার বাবার জায়গা। আমি এখান থেকে কোথাও যাবো না। বাচি মরি এখানেই থাকবো। এভাবে দীর্ঘদিন যাবার পর ডাক্তার মোছাব্বর মিয়া বিরক্ত হয়ে একদিন বাচা বাবা (রহ.)’র গায়ে গরম পানি ঢেলে দেয়। এসময় যন্ত্রণায় কাতর কণ্ঠে বাচা বাবা (রহ.) বলে উঠেন, ওরে বজ্জাত ডাক্তার তুই কি করলি। তুইতো নিজের সর্বনাশ নিজে ডেকে আনলি। তোর রেহাই নেই। এ কথা বলার সাথে সাথে প্রচণ্ড শব্দে ডাক্তারের পেট তার শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য মোছাব্বর মিয়াকে তখন লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু কাজ হয়নি।

বেয়াদবি বুঝতে পেরে মোছাব্বর মিয়ার স্ত্রীসহ পরিবারের লোকজন বাচা বাবা (রহ.)’র কাছে মাফ চান। বাচা বাবা (রহ.) বলেন, আমার কিছু করার নেই, আল্লাহ কলম মেরে দিয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে বাচা বাবার কাছে নানা জায়গা থেকে লোকজন আসতে থাকে দোয়া নেয়ার জন্য। একসময় যারা তাকে পাগল বলে আখ্যা দিয়েছিলো নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তারাও ছুটতে থাকেন বাচা বাবা (রহ.)’র কাছে। মোছাব্বর মিয়া মারা যাবার পর এই ঘটনার তদন্ত করে সরকার। তদন্তের ভার পরে রাঙ্গুনিয়া থানার সে সময়কার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার হাতে। তিনি এসেই বাচা বাবা (রহ.)’র সাথে অসভ্য আচরণ করতে থাকেন। এরপর থানায় যাবার পথেই রহস্যজনকভাবে মারা যান পুলিশের সেই কর্মকর্তা।

এরপর তদন্তের দায়িত্ব পরে জেলা পরিষদের সে সময়কার চেয়ারম্যান, মুসলীম লীগ নেতা, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর ওপর। বিষয়টি মনে মনে জানা হয় বাচা বাবার। একদিন আগেই ভক্তদের বলেন, কাল একজন দামি মেহমান আসবে, তোমরা একটি চেয়ার জোগাড় করো । পরদিন রাজকীয় ঘোড়ায় চড়ে হাসপাতালের সামনে আসেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। হাসপাতাল থেকে বেশকিছু দূরে ঘোড়া রেখে হেঁটে হাসপাতালের সামনে আসেন তিনি।

ঘোড়া থেকে নেমে শ্রদ্ধার সাথে বাঁচা বাবার( রহ.) কে সালাম দিয়ে বলেন, বাবাজান আসসালামু আলাইকুম। বাচা বাবা (রহ.) সালামের উত্তর দিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী-কে চেয়ারে বসতে বলেন। কিন্তু কোনোভাবেই চেয়ারে বসতে রাজি নন ফজলুল কাদের চৌধুরী। পাছে কোনধরনের বেয়াদবি হয়। বাচা বাবা (রহ.) ফজলুল কাদের চৌধুরীকে অভয় দিয়ে বলেন, সমস্যা নেই তুই একটু বসে আবার নেমে যা। বাচা বাবা (রহ.)’র কথামতো কয়েক মুহূর্তের জন্য ওই চেয়ারে বসে দ্রুত নেমে যান ফজলুল কাদের চৌধুরী।

পরবর্তীতে ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার থাকা অবস্থায় আইয়ুব খান চীন সফরে যান। সে সময় ফজলুল কাদের চৌধুরী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাচা বাবা (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লী মোহাম্মদ ইউসুফের মতে, বাচা বাবাকে সম্মান করে চেয়ারে বসে আবার উঠে যাবার পুরষ্কার হিসেবে বাচা বাবার দোয়াতেই ফজলুল কাদের চৌধুরী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী তদন্ত শেষে দেয়া প্রতিবেদনে বলেন, হাসপাতাল স্থাপিত জায়গাটি বাচা বাবার পৈত্রিক। এটি মোটেও খাস জায়গা নয়। পরে সেখান থেকে হাসপাতাল তুলে নিয়ে যাওয়া হয় অন্যত্র। এসব ঘটনার পর ক্রমশ বাচা বাবার আধ্যাত্মিক শক্তির খবর আরো প্রচার হয় চারদিকে। প্রতিদিন নানা বয়সী নারী-পুরুষ তার কাছে আসতে থাকে নানা সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে। মানুষ ফলও পেতো দ্রুত।

রাঙ্গুনিয়া সরফভাটা নিবাসী সৈয়দ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান জানান, তিনি মুরুব্বীদের কাছে শুনেছেন, এক সময় চট্টগ্রাম শহরের এনায়েতবাজার এলাকায় এনাম নামে এক দুর্ধর্ষ গুন্ডা ছিলো। তার ভয়ে এনায়েতবাজার এলাকাতো বটেই চারপাশের এলাকার লোকজন ভয়ে তটস্থ থাকতো। সেই এনাম গুন্ডা বাচা বাবার আধ্যাত্মিক শক্তির খবর পেয়ে ছুটে যান তার কাছে। পরবর্তীতে সবধরনের খারাপ কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভালো হয়ে যান এনাম।

বাচা বাবা (রহ.)’র কাছে কেউ গেলে তাকে খুব সহজে ছাড়তেন না তিনি। একটু বসো একটু বসো বলে আটকে রাখতেন। একবার রাউজানের কদলপুর মীর বাগিচা এলাকার মোশারফ হোসেন চৌকিদার’ বাড়ির মো. নজির আহম্মদ প্রকাশ আবাছা বৈদ্য (পল্লী কবিরাজ) দেখা করতে যান বাচা বাবার কাছে। কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে চাইলে বাচা বাবা তাকে আটকে রাখেন। ওইদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার অনুমতি পান। নজির আহম্মদ ভাবনায় পড়ে যান এই ভেবে যে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, পায়ে হেটে এতদূর সে কি করে বাড়ি যাবেন।

ভীরু মনে বাড়ির দিকে রওনা হয়ে বাচা বাবার বাড়ি থেকে অল্প দূরে ফাতেমা টিলার উচু জায়গায় দাড়িয়ে সূর্যের অবস্থান দেখে আবার বাচা বাবা (রহ.)র কাছে ফিরে যান। বাচা বাবা (রহ.) কে বলেন, আজ যাবো না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাচা বাবা (রহ.) তাকে বলেন, তুই বাড়ি যা সূর্য থাকবে। উনার কথামতো বাড়ির পথে যাত্রা করেন নজির আহম্মদ। যখন বাড়ি পৌঁছায় তখন গভীর রাত। বাড়ির লোকজন তাকে দেখে অবাক হয়ে ভাবে এমন ঘোর অন্ধকারে নজির আহম্মদ বাড়ি ফিরলো কি করে। নজির আহম্মদ বলেন, এত ভয়ের কি আছে, মাত্রতো সন্ধ্যা হলো। এরকম অসংখ্য কারামত রয়েছে এই আওলিয়ার।

আল্লাহর এই মহান অলির ফয়েজ বরকত আমাদের উপর বর্ষিত হোক আমিন 🤲।

✒️ শেখ বিবি কাউছার
প্রভাষক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
নোয়াপাড়া কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *