এশিয়ার প্রথম ডি. লিট ডিগ্রি অর্জনকারী রাউজানের ড. বেণীমাধব বড়ুয়া

মহান সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি যুগে প্রতিটি দেশে কিছু জ্ঞানী-গুণী মানুষের আবির্ভাব ঘটান, যাঁদের কর্মের গুণে ধন্য হয় পিতা-মাতা, দেশ, জাতি তথা বিশ্বজগৎ। আজ তেমনি একজন দিকপাল জ্ঞানসাধকের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, যিনি নিজ গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি হলেন লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এশিয়ার প্রথম ডি. লিট. (ডক্টর অব লিটারেচার) ডিগ্রি অর্জনকারী ভারততত্ত্ববিদ আচাযর্ ড. বেণীমাধব বড়ুয়া।

জন্ম ও শৈশব: বাংলার নবজাগরণের সেই সন্ধিক্ষণ

চট্টগ্রামের রাউজান থানার নিভৃত ও ছায়া সুনিবিড় মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে ১৮৮৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন ড. বেণীমাধব বড়ুয়া (যিনি বি.এম. বড়ুয়া নামেও সুপরিচিত)। কবিরাজ রাজচন্দ্র তালুকদার ও ধনেশ্বরী দেবীর ঘরে পাঁচ কন্যা সন্তানের পর প্রথম পুত্র হিসেবে তাঁর আগমনে পরিবারে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। তাঁর জন্মের সময়কালটি ছিল বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি তথা শিকড় সন্ধানের এক নবজাগরণের যুগ।

ইসলামের ইতিহাসে কালজয়ী তিন নারী: আদর্শ সমাজ ও নারী জাগরণের অনন্য আলোকবর্তিকা

শিক্ষাজীবন ও পারিবারিক পটভূমি

১৯০২ সালে গ্রামের মডেল স্কুল থেকে সফলতার সাথে এম. ই. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি চট্টগ্রাম শহরের সরকারি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ১৯০৬ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রাবস্থায় ১৯০৮ সালে পিতার ইচ্ছানুসারে তিনি নিজ গ্রামের পঙ্কজা সুন্দরীকে বিবাহ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে এই জ্ঞানসাধক ছিলেন ১১ সন্তানের জনক (৮ কন্যা ও ৩ পুত্র)। তিনি প্রতিটি সন্তানকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। তাঁর এই সফলতার পেছনে স্ত্রী পঙ্কজা সুন্দরীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। জ্ঞানচর্চায় মগ্ন ও সংসারের প্রতি উদাসীন বেণীমাধব বড়ুয়াকে সেবা ও যত্নে আগলে রেখেছিলেন তাঁর স্ত্রী, যাঁর উদার সহযোগিতাই তাঁকে বিশ্বমঞ্চে আসীন হতে সাহায্য করেছিল।

উচ্চশিক্ষা ও অভূতপূর্ব সাফল্য

ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার শিক্ষাজীবন ছিল সাফল্যে মোড়ানো:

১৯১১: বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে পালিতে দ্বিতীয় শ্রেণির অনার্সসহ বি.এ. পাশ।

১৯১৩: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ।

১৯১৭: লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘Indian Philosophy: Its Origin and Growth from the Vedas to the Buddha’ শীর্ষক গবেষণাপত্রের জন্য এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ডি. লিট. অর্জন।

মুনাফার লোভে মনুষ্যত্ব বিসর্জন: বিপন্ন জনস্বাস্থ্য ও আমাদের দায়বদ্ধতা

পেশাদার জীবন ও পাণ্ডিত্য

লণ্ডন থেকে ফিরে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালিশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও তিনি ১৯১৯-৪৮ সাল পর্যন্ত সংস্কৃত বিভাগ এবং ১৯২৭-৪৮ সাল পর্যন্ত প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ১৯৩০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দেশের প্রথম ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর অব পালি’ পদে ভূষিত করে।

তিনি শিলালিপি পাঠোদ্ধার ও ব্যাখ্যায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ১৯৪০ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন এবং ‘বিমলা চরণ লাহা স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে শ্রীলঙ্কার পণ্ডিতগণ তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘ত্রিপিটক আচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

রচনাসম্ভার: তাঁর সৃষ্টিকর্মের পরিধি বিশাল। তিনি ইংরেজিতে ১৮টি, বাংলায় ৭টি গ্রন্থ এবং ইংরেজি ও বাংলায় শতাধিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বলা হয়, সর্বভারতীয় কোনো বৌদ্ধ পণ্ডিত আজও তাঁর সমপর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হননি।

প্রবাসী শিশুদের সমস্যা ও তা সমাধানের উপায়

ব্যক্তিত্ব: অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতা

ব্যক্তিগত জীবনে ড. বড়ুয়া ছিলেন অনাড়ম্বর, প্রগতিবাদী ও সংস্কারমুক্ত। বৌদ্ধ পরিবারে জন্ম নিলেও তিনি ছিলেন ঘোরতর অসাম্প্রদায়িক। তাঁর কন্যা ড. অনীতা পাকড়াশীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে তিনি চার্চ ও মসজিদেও দান করেছিলেন। এমনকি বড় মেয়ের বিয়েতে পাদ্রী, মোল্লা, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের একত্র করে মন্ত্র পাঠ করিয়েছিলেন—যা সেই যুগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল।

তাঁর ছাত্র, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেনের মতে, শত শত ভালো ছাত্রের মাঝে ড. বেণীমাধব বড়ুয়া ছিলেন বিরল এক ‘ভালো গুরু’, যাঁর প্রভাব ছাত্রদের মনে আজীবন সক্রিয় থাকে।

মহাপ্রয়াণ ও উত্তরসূরিদের করণীয়

১৯৪১ সালে তিনি শেষবারের মতো চট্টগ্রামে আসেন এবং নোয়াপাড়া গ্রামে এক সংবর্ধনা সভায় ভাষণ দেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ মার্চ এই মহান জ্ঞানসাধক ৬০ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার মতো গুণী মানুষের কর্ম সমাজকে আলোকিত করে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁদের জীবনদর্শন তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দর্শন চর্চার মাধ্যমেই তাঁদের অমর করে রাখা সম্ভব। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নিয়মিত গবেষণা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম হওয়া প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সংরক্ষণে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

বিবি কাউসার
বিশেষ নিবন্ধ | শেখ বিবি কাউছার প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *